মেক-আপের আগে ত্বকের যত্ন

বাংলার কথা ডেস্ক ০

সব জিনিসেরই যেমন একটা প্রস্তুতিপর্ব থাকে, তেমনই মেক-আপের জন্য ত্বককে প্রস্তুত করাও প্রয়োজন। মানে সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ত্বকের সামগ্রিক যত্ন নেওয়া জরুরি ।

সব জিনিসেরই যেমন একটা প্রস্তুতিপর্ব থাকে, তেমনই মেক-আপের জন্য ত্বককে প্রস্তুত করাও প্রয়োজন। মানে সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ত্বকের সামগ্রিক যত্ন নেওয়া জরুরি। সারাবছর নিয়ম করে ত্বকের যত্ন নিন। এতে ত্বক হবে উজ্জ্বল, সজীব। মনে রাখবেন, সুস্থ ত্বকের উপর মেক-আপের প্রলেপ আপনার রূপের জেল্লা বাড়িয়ে দেবে বহুগুণ। তুলনায় অযত্নে থাকা ত্বকে আপনি যতই মেক-আপের প্রলেপ বোলান না কেন, কিছুতেই সেই ঔজ্জ্বল্য আসবে না। মুখের ত্বক অনেক বেশি কোমল। তাই মুখের জন্য দরকার একটু স্পেশাল কেয়ার। এর জন্য নিয়মিত যত্নের বাইরে ফেস স্ক্রাবিং এবং ত্বকের ধরন অনুযায়ী ফেস প্যাক ব্যবহার করতে হবে।
ক্লেনজ়িংটোনিংময়শ্চারাইজ়িং

সারাদিনের জমে থাকা ধুলোময়লা, ঘাম, তেল রোমকূপে জমে ত্বকের ক্ষতি করে। ত্বক পরিষ্কার না থাকলে রোমকূপের মুখ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে স্কিন রিনিউয়াল ও রিপেয়ার প্রসেস ঠিকমতো হয় না। তাই স্বাভাবিক, শুষ্ক বা তৈলাক্ত যে ধরনের ত্বকই হোক না কেন ক্লেনজিং খুব জরুরি। তবে সাবান দিয়ে মুখ পরিষ্কার না করে ক্লেনজ়িং মিল্ক বা জেল দিয়ে মুখ পরিষ্কার করুন। এরপর পরিষ্কার জলে মুখ ধুয়ে নিন। খাওয়ার জল দিয়ে মুখ ধুতে পারলে ভাল হয়। মুখ পরিষ্কার করার পর তুলোয় টোনার নিয়ে ভাল করে মুখ মুছে নিন। টোনার আপনার ত্বকের টানটান ভাব বজায় রাখতে সাহায্য করবে। ক্লেনজ়িং, টোনিং-এর মতোই ময়শ্চারাইজ়িং কিন্তু অত্যন্ত জরুরি। কারণ, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ত্বক ক্রমশ শুষ্ক হয়ে পড়ে, ফলে বলিরেখার সমস্যা আরও বেশি করে দেখা দেয়। তাই মুখ পরিষ্কার করার পর অবশ্যই কোনও ভাল ময়শ্চারাইজার লাগান। ময়শ্চারাইজ়ার ত্বক হাইড্রেটেড রাখে, ত্বক ভাল থাকে। নিয়মিত যত্ন ছাড়াও ডিটক্স রুটিনে ত্বক বুঝে প্রত্যেক ৩-৭ দিনে একবার স্ক্রাব করুন। এতে মৃত কোষ দূর হয় এবং ত্বক সুন্দর ও সজীব হয়ে ওঠে। স্ক্রাবার মুখে লাগিয়ে হালকা হাতে সার্কুলার মোশনে ত্বক স্ক্রাব করে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

ঘরোয়া উপায়
ক্লেনজ়িং: ডিমের কুসুম ক্লেনজ়ার হিসেবে দারুণ কাজ করে। এর ক্লেনজ়িং প্রপার্টি মুখে জমে থাকা ধুলো ময়লা তেল পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। ডিমের কুসুম ফেটিয়ে মুখে লাগিয়ে নিন। ২০ মিনিট অপেক্ষা করে ধুয়ে ফেলুন। ২ টেবলচামচ বেসনের সঙ্গে এক চিমটে হলুদগুঁড়ো সামান্য দুধ মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে নিন। মিশ্রণটি ক্লেনজ়ার হিসেবে দারুণ ভাল কাজ করবে। মিশ্রণটি মুখে লাগিয়ে ১০ মিনিট অপেক্ষা করে ধুয়ে ফেলুন। মধু ক্লেনজ়ার হিসেবে দারুণ ভাল কাজ করে। জল দিয়ে ভাল করে মুখ ধুয়ে নিন। হাতের তালুতে ২ চা-চামচ মধু নিন। এর সঙ্গে কয়েকফোঁটা ঈষদুষ্ণ জল মিশিয়ে মুখে ও গলায় লাগিয়ে নিন। পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করে হালকা হাতে ঘষে ঈষদুষ্ণ জল দিয়ে ভাল করে ধুয়ে ফেলুন। তারপর শুকনো তোয়ালে দিয়ে ভাল করে মুখ মুছে নিন। এটি ক্লেনজ়িং-এর সঙ্গে টোনিং-এও সাহায্য করবে। একটা পাত্রে ক্যাস্টর অয়েল নিন, তবে কতটা পরিমাণে ক্যাস্টর অয়েল নেবেন তা নির্ভর করবে আপনার ত্বকের ধরনের উপর। তৈলাক্ত ত্বকের জন্য ২ চা-চামচ ক্যাস্টর অয়েল নিন। স্বাভাবিক ত্বকের জন্য /২ চা-চামচ আর শুষ্ক ত্বকের জন্য ১ চা-চামচ ক্যাস্টর অয়েল নিন। এর সঙ্গে নিজের মনের মতো যে কোনও ক্যারিয়র অয়েল (জোজোবা, সুইট আমন্ড) মিশিয়ে নিন। রাতে শুতে যাওয়ার আগে জল দিয়ে মুখ ধুয়ে তুলোয় মিশ্রণটি নিয়ে মুখ ও গলায় লাগিয়ে নিন। পাঁচমিনিট অপেক্ষা করুন। তারপর ভিজে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে নিন।

টোনার: ত্বক মসৃণ, টানটান এবং উজ্জ্বল রাখার জন্য টোনিং-এর কোনও বিকল্প নেই। গ্রিন টিও কিন্তু সবথেকে ভাল প্রাকৃতিক স্কিন টোনার। গরম জলে গ্রিন টি আধঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। ঠান্ডা হলে ছেঁকে বোতলে ভরে রাখুন। এরসঙ্গে সামান্য গোলাপ জল, গ্লিসারিন, অ্যালোভেরার রস ও এসেনশিয়াল অয়েল (যে কোনও) মেশান। মিশ্রণটি ফ্রিজে স্টোর করতে পারেন। প্রতিবার মুখ ধোওয়ার পর তুলোয় এই টোনার লাগিয়ে খুব হালকা করে মুখ ও গলা ভাল করে মুছে নিন। টোনার হিসেবে দারুণ কাজ করবে। নিয়মিত লাগালে ত্বকে রক্তসঞ্চালন ভাল হবে, ত্বক টানটান হবে, জেল্লাও বাড়বে।  ডিমের সাদা অংশ টোনার হিসেবে দারুণ কার্যকর। মুখ পরিষ্কার করার পর ডিমের সাদা অংশ লাগিয়ে নিন। আধশুকনো হলে ধুয়ে ফেলুন। শসার রসও টোনার হিসেবে দারুণ ভাল কাজ করে। শসা কুরে নিয়ে মুখে লাগাতে পারেন। ২০ মিনিট পর জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। প্রতিদিন যদি একবার করে লাগাতে পারেন দেখবেন চামড়া টানটান হবে।

ময়শ্চারাইজ়ার: /৪ কাপ ওটমিল সিদ্ধ করে নিন। এবার এই সিদ্ধ করে রাখা ওটমিলের সঙ্গে এক টেবলচামচ অ্যালোভেরার নির্যাস এবং দু’ টেবলচামচ মধু ভাল করে মিশিয়ে এয়ারটাইট কন্টেনারে ভরে ফ্রিজে রেখে দিন। এই মিশ্রণ দু’ থেকে তিনদিন মতো ফ্রিজে রেখে দেওয়া যায়। যাঁদের ত্বক খুব শুষ্ক তাঁদের জন্যে এই প্যাক খুবই উপকারী। এছাড়া শীতকালেও এই ময়শ্চারাইজ়ার ব্যবহার করতে পারেন। ত্বকে রুক্ষতার ছাপ পড়বে না। দিনে দু’বারও এই মিশ্রণ সারা মুখে ও গলায় লাগাতে পারেন। অ্যালোভেরা স্কিন ইরিটেশন কমাতেও সাহায্য করে। ত্বক হাইড্রেটেড ও কোমল রাখার জন্যে গোলাপ জল ও গ্লিসারিনের ময়েশ্চারাইজ়ার খুবই উপকারী। দু’টেবল চামচ গোলাপ জলের সঙ্গে এক টেবল চামচ গ্লিসারিন মিশিয়ে এয়ারটাইট কন্টেনার করে ফ্রিজে রেখে দিন। অনেকদিন ভাল থাকে এই মিশ্রণ। প্রতিদিন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে মুখ ভাল করে ধুয়ে নিয়ে সারা মুখে এই লোশন লাগিয়ে নিন। সকালে উঠে জল দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন। এক টেবল চামচ অলিভ অয়েলের সঙ্গে এক টেবল চামচ নারকেল তেল, দু’ টেবল চামচ স্ট্রবেরি পেস্ট এবং দু’ ফোঁটা ভিটামিন ই তেল মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারেন ময়শ্চারাইজ়ার হিসেবে। / কাপ নারকেল তেল, ১চা-চামচ লিক্যুইড ভিটামিন ই, পাঁচ-সাত ফোঁটা ল্যাভেন্ডার এসেনশিয়াল অয়েল বা টি ট্রি অয়েল মিশিয়ে ময়শ্চারাইজ়ার তৈরি করে নিন।

স্ক্রাবার: আমন্ডগুঁড়ো দিয়ে বাড়িতেই স্ক্রাবার বানিতে ফেলতে পারেন। /২ চা-চামচ আমন্ডগুঁড়োর সঙ্গে এক চা-চামচ গোলাপ জল ভালভাবে মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণটি সারা মুখে ও গলায়  লাগিয়ে সার্কুলার মুভমেন্টে দু’মিনিট মতো মাসাজ করে ঠান্ডা জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। যাঁদের ত্বক একটু শুষ্ক তাঁরা এরসঙ্গে এক চা-চামচ ক্রিম ও এক চা-চামচ মধু মিশিয়ে নিন। সপ্তাহে দু’দিন কাজের মাঝে  একটু সময় বার করে এই স্ক্রাব ব্যবহার করুন। এই স্ক্রাব ত্বকের উপরে জমে থাকা মরা কোষ দূর করার পাশাপাশি ত্বককে ময়শ্চারাইজ়ও করে। ত্বক উজ্জ্বল ও নরম হবে। স্ক্রাবার হিসেবে কফি সিদ্ধহস্ত। তিন-চার চামচ কফি পাউডার, দু’টেবলচামচ ওয়াইন ভিনিগার, দু’ চা-চামচ সি সল্ট, এক চা-চামচ আদার রস একসঙ্গে মিশিয়ে ঘন পেস্ট তৈরি করে মুখে লাগিয়ে নিন। মুখের পাশাপাশি গলা ও ঘাড়ে লাগাতে ভুলবেন না। ইচ্ছে হলে সারা শরীরেও লাগাতে পারেন। স্ক্রাবার হিসেবে মিশ্রণটি দারুণ কাজ করে। মিশ্রণটি লাগানোর পর কিছুক্ষণ হালকা হাতে সার্কুলার মুভমেন্টে ঘষতে থাকুন। পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। ত্বকের মরা কোষ, ধুলোময়লা দূর করার পাশাপাশি  ত্বক প্রাণবন্ত করতে সাহায্য করবে। এর পাশাপাশি এক টেবলচামচ ওটমিলের সঙ্গে এক চা-চামচ লেবুর রস ও দু’চা-চামচ দই ভালভাবে মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণ মুখে ও গলায় লাগিয়ে সার্কুলার মুভমেন্টে মাসাজ করুন। স্ক্রাব করার পরেই মুখ ধুয়ে ফেলবেন না। ১০ মিনিট মতো এই স্ক্রাব মুখে ও গলায় রেখে দিন। তারপরে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এই স্ক্রাব মুখে রক্ত সঞ্চালন বাড়ানোর পাশাপাশি ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখে।
ত্বকের প্রকৃতি অনুযায়ী যত্ন
শুষ্ক ত্বক: রাতে শুতে যাওয়ার আগে মুখে ও গলায় নারিশিং ক্রিম লাগিয়ে হালকা হাতে কিছুক্ষণ মাসাজ করুন। এর পাশাপাশি সপ্তাহে একদিন বা দু’দিন ফেস মাস্কও ট্রাই করতে পারেন।  মধু, সামান্য দুধ ও আমন্ড অয়েল একসঙ্গে মিশিয়ে মুখে লাগাতে পারেন। ১৫ মিনিট অপেক্ষা করে ধুয়ে ফেলুন। দুধ, মধু ও অমন্ড অয়েল ত্বককে ভিতর থেকে নারিশ করবে ফলে আপনার  শুষ্ক ত্বকের সমস্যা অনেকটা কমবে।

তৈলাক্ত ত্বক: সপ্তাহে তিনদিন ফেশিয়াল স্ক্রাবার ব্যবহার করতে পারেন। এতে ত্বকের ডিপ পোর ক্লেনজ়িং হয়ে যাবে। তৈলাক্ত ত্বকের জন্য মুলতানি মাটি খুব ভাল। মুলতানি মাটির সঙ্গে গোলাপ জল মিশিয়ে নিন। এই পেস্টটি সপ্তাহে তিনদিন মুখে লাগান। শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ফেলুন। মুখের অতিরিক্ত তেলাভাব কমে যাবে।

নির্জীব ত্বক: ত্বকের জেল্লা বাড়াতে সপ্তাহে দু’-তিনদিন ফেশিয়াল স্ক্রাবার ব্যবহার করুন। ওটের সঙ্গে ডিমের সাদা অংশ ভাল করে মিশিয়ে মুখে (চোখ  ও ঠোঁটের চারপাশ বাদ দিয়ে) লাগিয়ে নিন। ১৫ মিনিট অপেক্ষা করে ভিজে হাতে আস্তে আস্তে ঘষে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। একইভাবে মধু, লেবুর রস এবং ডিমের সাদা অংশ মিশিয়েও মুখে লাগাতে পারেন। ১৫ মিনিট অপেক্ষা করে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। কিছুদিন করলে দেখবেন, আপনা থেকেই ত্বকের স্বাভাবিক জেল্লা ফিরে এসেছে।

মেক-আপ বেশিক্ষণ ভাল রাখার জন্য

মেক-আপ দীঘর্ক্ষণ ভাল রাখার জন্য মেক-আপ শুরু করার আগে একটা পরিষ্কার কাপড়ে আইস কিউব জড়িয়ে ভাল করে মুখ মুছে নিন। রোমকূপের মুখ বন্ধ করতে সাহায্য করবে। ঘামও কম হবে। মেক-আপ ভাল করে বসবে। লিপস্টিক লাগানোর আগে ঠোঁটে সামান্য ফাউন্ডেশন লাগিয়ে নিন। লিপস্টিক সহজে উঠে যাবে না। মেক-আপ রিটাচ করার জন্যে ব্যাগে কমপ্যাক্ট ক্যারি করুন। ব্যাগে টিস্যু ক্যারি করবেন। ঘাম হলে হালকা করে টিস্যু দিয়ে মুছে নিন। মেক-আপ করার পর বারবার মুখে হাত দেবেন না। এতে মেক-আপ স্মাজ় হয়ে যাবে, হাতের ময়লা ও ব্যাক্টেরিয়া লেগে ত্বকের ক্ষতি হবে।

সূত্র:সানন্দা।

বাংলার কথা/ আগষ্ট ১১, ২০২০

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
%d bloggers like this: