বৃষ্টিভেজা আনন্দ

বৃষ্টিভেজা আনন্দ
-ইকবাল হোসেন

বাবা, তাড়াতাড়ি এসো। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। প্লিজ, বাবা তাড়াতাড়ি এসো। বৃষ্টি থেমে গেলে আর ভিজতে পারব না। সেজুতি চিৎকার করতেই আছে। স্বনন মেয়েটাকে কিছুতেই বোঝাতে পারে না। হাত ধরে টানতে টানতে তাকে নিয়ে গেল ছাদে।

সে বলতেই থাকল, ‘মা এখন আমি ভিজতে পারব না। আমার জরুরি কাজ আছে বাইরে যেতে হবে।’- বাবার কথা মেয়ের কান অবধি পৌঁছাল কি না কে জানে! ততক্ষণে ভিজে একাকার।

দুজনে অনেকক্ষণ ভিজল। মেয়ের সাথে ছুটোছুটি, লাফালাফি করল।

মেয়ের সাথে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সে যেন স্মৃতির পাতায় হারিয়ে গেল।

ঝমঝম বৃষ্টি দেখলেই দৌড়ে নামতাম উঠোনে। আর দাদির চিৎকার শুরু হত। এই স্বনন তাড়াতাড়ি ওঠ। ভিজিস না। ঠাণ্ডা লাগবে। কে শোনে কার কথা? ততক্ষণে আমার লাফালাফি চলছে। কাদার মধ্যে পা চালিয়ে কিছু কিছু জায়গায় গর্ত করে ফেলেছি। দৌড়াচ্ছি এদিক সেদিক। দুহাত দুদিকে নিয়ে পাখির মত ডানা মেলে ছুটছি। দাদি চিৎকার করেই চলেছে।

অবশেষে দাদি বলত, থাম লাঠি নিয়ে আসছি। মা তখন বলত, থাক না মা একটু ভিজুক। ওর যখন এত ইচ্ছে করছে, একটু ভিজুক না। তখন দাদি চুপ করত।

মা তখন নিজেও আমার দিকে মিটিমিটি তাকিয়ে এক গাল হাসি দিয়ে নিজেও উঠোনে নেমে পড়ত। একাজ সেকাজের অজুহাতে নিজেও ভিজত আর আমার কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরত।

আমি তখন আহ্লাদিত হয়ে আরও লাফালাফি শুরু করতাম আর দৌড়ে দৌড়ে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তাম।

যখন মাধ্যমিকে পড়তাম। কোন কোনদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় বৃষ্টি শুরু হলে বইগুলো জামার নিচে নিয়ে ভিজতে ভিজতে চলে আসতাম। যদি আশেপাশে কোন দোকান খোলা পেলে আনন্দ যেন আর ধরে না! বই, খাতা, কলম পলিব্যাগের মধ্যে নিয়ে আয়েস করে ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফেরা হত।

দশম শ্রেণিতে পড়ি। একদিন স্কুল ছুটি হওয়ার পর বাড়ি অভিমুখে আসছি। চারপাশ কালোমেঘের ছায়ায় অন্ধকার হয়ে গেল। মেঘের সে কি গর্জন! খুব ভয়ে ভয়ে হাঁটছি। পেছনে পায়ের আওয়াজ। তাকিয়ে দেখি আমাদের পাড়ারই একটা মেয়ে। সিমি। আমার থেকে দুবছরের ছোট। পাশের গার্লস স্কুলে পড়ে। আমাকে দেখেই বলে, স্বনন ভাই আমাকে সাথে নাও না, খুব ভয় করছে। আমিও ভাবলাম, ভালোই হল। আমারও ভয় লাগছিল। মেঘের ডাক শুনে মনেই হচ্ছিল কোথাও না কোথাও বাজ পড়বে।

দুজনে খুব দ্রুত হাঁটছি। এমনিতেই ওর সাথে কথাবার্তা ওরকম হত না। কাজেই চুপচাপ দুজনেই।

সিমি বলল, বৃষ্টি শুরু হলে মজা হত। বাসায় আম্মু ভিজতে দেয় না কিন্তু আমার খুব ভিজতে ইচ্ছে করে।

সত্যিই তাই, বৃষ্টিতে ভিজতে কার না মন চায়!

কিছুক্ষণের মধ্যে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। মহা আনন্দে দুজন ভিজছি। ওর দিকে চোখ দিতেই মনে হল। কী সুন্দর! বৃষ্টির জল ওকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে পড়ছে। ওর চোখ বন্ধ। দুহাত দুদিকে প্রসারিত করে ঘুরছে। শিহরণের অপরিসীম আনন্দে যেন সে আত্মহারা। সালোয়ার কামিজ ভিজে চুপসে গেছে।
আমার মুগ্ধচোখে তাকিয়ে থাকা দেখে লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল। খুব করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, তুমি এত সুন্দর ক্যান? কী অপূর্ব লাগছে তোমাকে! কিন্তু কিছুই বলা হয়নি।
একটু পর ওর বাবা ছাতা হাতে এসে ওকে নিয়ে গেল।

কলেজে পড়ি। একটা মেয়েকে ভীষণ ভাল লেগে গেল। কিন্তু নাম, ঠিকানা কিছুই জানি না। পিছু নিলাম। বেশ কিছুদিন ধরে ঘুরে ঘুরে কোন উপায় পেলাম না। পরে শুনি আমার রুমমেটও ওকে পছন্দ করে।

বেলোনা, প্রথম বর্ষে পড়ত। দেখতে খুব কিউট। কী নিষ্পাপ চেহারা! মনে হত চেয়েই থাকি। একদিন কলেজের তৃতীয় তলায় একা পেয়ে কথা বলতে চাইলে সে বলে আমার এখন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।

সে চলে যাচ্ছিল। পেছন থেকে বেলোনা বলে ডাকতেই চমকে ফিরে তাকালো। কারণ বেলোনা নামটা অন্য কারো জানা ছিল না। ওকে সবাই পুষ্প বলে চিনত।

ওকে বলেছিলাম, বৃষ্টিতে ভিজতে চাও? তোমার সাথে রিকসায় ঘুরতে ঘুরতে যদি বৃষ্টিতে ভিজতে পারতাম! কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। তবে বৃষ্টি হলেই টিভি রুমের পাশের ছাদে গিয়ে ইচ্ছেমত ভিজতাম। বাস্তবে সে না থাকলেও মনের আল্পনায় ওকে নিয়ে কত্ত নেচেছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় সম্মান দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি। একদিন মুষলধারে বৃষ্টি। কয়েক ঘণ্টায় রাস্তা ঘাট পানির ড্রেন ডুবে গিয়েছিল। বন্ধুরা মিলে ঠিক হল পিকনিক হোক। ডিম-খিচুরি, গরুর গোস্ত খাওয়া হবে। সেদিন অনেকেই প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ভিজেছিলাম। কেউ কেউ ড্রেনে ডুবে গিয়েছিল।
অবন্তি, সেও ভিজেছিল। খুবই সহজ ছিল তার মেশামিশি। কেউ কেউ বলেছিল, তোদের জ্বর হবে, সর্দি কাশি হবে। সত্যি বলতে কি আমরা কেউ অসুস্থ হইনি।

এরকম মাঝে মাঝেই বৃষ্টিতে ভেজা হতো। মনের আয়েশে ভিজতে ভিজতে হাঁটতাম প্যারিস রোড ধরে। শিরীষ গাছের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা- বৃষ্টি থেমে গেলেও গাছ চুঁয়ে পড়া বড় ফোঁটা গায়ে পড়ত আর অসম্ভব ভালোলাগার শিহরণে কেঁপে কেঁপে উঠতাম। বৃষ্টিভেজা এ আনন্দে কখনও কখনও সাথী হত বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ। আবার কখনও কখনও সাথী হত অজানা অচেনা কেউ। বন্ধুরা সাথে থাকলে লাফালাফি আর চিৎকার একটু বেশি হত।

একদিন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে ক্লাস থেকে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে এক দৌড়ে চারতলা থেকে নিচে নেমে বৃষ্টিতে ভিজছিলাম।

হঠাৎ তাকিয়ে দেখি, একটা মেয়ে অপরিসীম আনন্দে ভিজছে- তার চোখেমুখে যেন লেপ্টে আছে পরম সুখের অনুভূতি। ভিজে চুপসে গেছে সে। সমস্ত শরীরে তার উপচে পড়া আনন্দ যেন ঢেউ খেলছে। কোনদিকে তার কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। একেবারে সাবলীল। বৃষ্টির নিষ্পাপ জলের স্পর্শ ওর সৌন্দর্যকে যেন আরও সুন্দর করে সাজাচ্ছে- স্বর্গ থেকে নেমে আসা পরি।

মেয়েটার নাম ঝর্ণা। ইংরেজিতে পড়ে। তারপর থেকে মেয়েটাকে খুব করে দেখতাম। দেখলেই যেন মনের মধ্যে একটা ভাললাগা ও উচ্ছ্বাসের আমেজ। এ যেন এক পবিত্রতার প্রতিমূর্তি। হাসি দেখলেই মনে হত এ যেন এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য।

পরিচয়ের প্রথম দিনেই আমাকে বলেছিল, কী ব্যাপার, আপনি হা করে তাকিয়ে থাকেন কেন? কথা বলতে পারেন না?

আমি অবনত চোখে অবলীলায় বলেছিলাম, তোমাকে দেখলেই মনে হত স্বর্গ থেকে নেমে আসা পরি- কথা বলা যায় না, ছুঁয়ে দেখা যায় না, শুধু দূর থেকে দেখা যায়- কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলেই আমি চুপ।

আমার কথা শুনে কারও মুখে কোন কথা নেই। সবাই একেবারে চুপ।

কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ঝর্ণা মুখ তুলে বলে, ‘আমার দিকে তাকান- দেখেন আমি খুবই সাধারণ একজন মানুষ।’ আপনার মতই বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসি। স্থান, কাল, পাত্র বিবেচনায় না নিয়েই বৃষ্টির জলের স্পর্শ নিতে শুরু করি।
আমার পাশে এসে বসল। বলল, আমার হাতটা ধরেন। আমার চোখের দিকে দেখেন- বলেই হা হা করে হাসতে শুরু করে।
সবাই চমকে উঠেছিলাম। সে বলে উঠল, কেমন চমকে দিলাম সবাইকে।

একদিন রাত বোধহয় দুইটার দিকে বন্ধুরা মিলে কার্ড খেলছিলাম। হঠাৎ ঝুমবৃষ্টি শুরু হল। একদৌড়ে হলের বাইরে চলে আসলাম। আমাকে ভিজতে দেখে বন্ধু হাসান বলল, কীরে অসুখ বাধাবি নাকি?
আমি বললাম,
বৃষ্টি মানেই আমার কাছে আশীর্বাদ
বৃষ্টি মানেই অনাবিল শান্তির পরশ
বৃষ্টি মানেই ভালোবাসার আলিঙ্গন
বৃষ্টি মানেই প্রেয়সীর উত্তাল ঢেউ।

বন্ধুটা বলল, হয়েছে হয়েছে। বাদ দে তোর কিছু হবে না। কিন্তু ততক্ষণে বাকি বন্ধুরা নেমে পড়েছে। প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে সবাই মিলে লাফালাফি করে হলে ফিরলাম। গেটম্যান আমাদের দেখে হা হা করে একটা হাসি দিয়ে বলল, আপনারা সত্যি পাগল।

আমি বললাম, মামা এরকম পাগল খুঁজে পাবেন না। রুমে ফিরে গোসল সেরে সবাই সিগারেটের আর এক পর্ব সেরে ঘুমোতে গেলাম। হাসানকে জোর করে ভেজানো হয়েছে। ভয়ে ভয়ে ভেজার কারণে কি না জানি না হাসান বেশ কদিন ধরে অসুস্থ ছিল। সবাই ওকে বেশ জালিয়েছিলাম।

সত্যিকথা বলতে ক্যাম্পাস জীবনে বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দ ছিল অবাধ, অদ্ভুত ও ভীষণ আনন্দময়।

সম্মান শেষ বর্ষে তখন। খুব বৃষ্টি। রাস্তা ঘাট ডুবুডুবু। একটা মেয়ে হাঁটু অবধি পায়জামা তুলে বৃষ্টির জলে পা দিয়ে জল উপচাচ্ছে আর চতুর্দিকে ছড়াচ্ছে। আমি অবাক হয়ে দেখছি। হঠাৎ ওরই উচলানো এক পশলা জলের ছটা আমার পুরো মুখ ভিজিয়ে দিল। ভীষণ রাগ হল। আমিও নেমে পড়লাম বৃষ্টির জলে। ওর দিকে হাত দিয়ে জল ছোঁড়া শুরু করলাম। মেয়েটা ভিজে গিয়ে কান্না শুরু করল। আমি তো হতভম্ব। কী করব বুঝতে পারছি না।

অতনু ছুটে এসে আমার পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইলে তবেই সে থামে।
আমি সরি বললাম। দেখেই মনে হচ্ছিল জুনিয়র কাজেই বললাম, তোমার নাম কী?
স্বীকৃতি।
কোন বিষয়, কোন ইয়ার?
মিউজিক, ফার্স্ট ইয়ার।
দারুণ তো, মিউজিক, চমৎকার বিষয়।
ধন্যবাদ, কিন্তু জানেন, এ সাবজেক্ট বাবার খুবই অপছন্দ। কিন্তু আমার ভীষণ পছন্দ।

ওয়াও, কী মজার বিষয়! আমি বলতে শুরু করলাম- জানেন, আমিও অভিনয়, গান ভীষণ পছন্দ করি। প্রথম বর্ষে পড়ার সময় মাস ছয়েক নাটকের সাথে যুক্ত ছিলাম। বাড়ি থেকে ক্লাস করতাম তখন। প্রতিদিন বিকেলে গ্রুপ কল থাকত। তিনটা বা চারটা। আমি ক্যাম্পাস থেকে বাড়ি গিয়ে বিকেলে আবার আসতাম ক্যাম্পাসে।

একদিন বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করল, প্রতিদিন বিকেলে তুমি কোথায় যাও?
ক্যাম্পাস যাই।
কেন? ক্লাস করতে নাকি অন্যকাজে?
না বাবা, একটা নাট্য সংগঠনে যাই।
কেন? অভিনয় করতে?
হ্যাঁ।
তখন সে সাফ জানিয়ে দিল, ওসব অভিনয় টভিনয় করতে হলে নিজের খরচ নিজে চালাও।
সেখানেই ইতি হল আমার অভিনয় জীবনের। যদিও বাস্তবে জীবননাট্যে অভিনয়ের বোধহয় শেষ নেই। প্রতিনিয়ত আমরা অভিনয় করছি- কখনও নিজের সাথে কখনও বা অন্যের সাথে। একমাত্র মৃত্যুই এর শেষ অঙ্ক।

এতো গেল একটা দিক, আরেকটা দিকও আছে। বন্ধুরা আমাকে বলত, আমার গানের গলা নাকি বেশ ভাল। গানের চর্চা করলে ভাল হবে। আমি তো জানতাম, বাবা গান শুনতে ভালোবাসে কিন্তু গান গাওয়াটা তার মোটেও পছন্দের না। কাজেই কখনই তাকে বলতে পারিনি আর আমারও গান গাওয়ার জন্য কোন ইনস্ট্রুমেন্টসও কেনা হয়নি। যদিও আমি গান শুনতে ভীষণ ভালোবাসি। বন্ধুদের আড্ডায় এখনও খালি গলায় গান গাই, মজা করি।
ভালোই হল তোমার সাথে পরিচিত হয়ে। এখন মাঝে মাঝে গান শোনা যাবে। আড্ডা দেয়া যাবে। কী বল?

হ্যাঁ ভাইয়া ঠিক আছে। আসলে আপনার কথা শুনছিলাম। এত চমৎকার করে বলছিলেন যে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলাম।

এরপর থেকে ওর সাথে মাঝে মাঝে দেখা হত। গান হত। আড্ডা হত। এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতাম। বেশ সুন্দর ছিল সময়গুলো। একদিন ওকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি বৃষ্টিতে ভিজতে খুব পছন্দ কর?

হ্যাঁ, ভীষণ। জানেন বৃষ্টিতে ভেজার জন্য বাবা মায়ের কাছে কত যে বকা খেয়েছি। তবে এখন আর তারা কিছু বলে না। তারা বুঝে গেছে- এই পাগলি মেয়েকে এ বিষয়ে বলে কোন লাভ নেই।

আমারও খুব ভালো লাগে। বৃষ্টি দেখলেই ভীষণ এক মায়াবী টানে যেন তার ছোঁয়া নিতে ছুটে চলি।
এখনও বৃষ্টি হলেই মহাআনন্দে নির্মল সে জলের ছোঁয়ায় নিজেকে সিক্ত করি। এ যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি, স্বর্গীয় প্রেম।

০ ইকবাল হোসেন, সহকারী শিক্ষক, রাজশাহী সরকারি পিএন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়

বাংলার কথা/আগস্ট ১২, ২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
%d bloggers like this: