বাঘায় দাদন ব্যবসা জমজমাট, সুদের দায়ে বাড়ি ছাড়ছেন অনেকে


নিজস্ব প্রতিবেদক, রাঘা (রাজশাহী) ০
যার যখন ইচ্ছে, কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে খুলে বসছেন সমিতি। নামমাত্র এসব সমিতি খুলে সুদের বিনিময়ে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ অনেককেই ঋণ দিচ্ছে তারা। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিও টাকার প্রাচুর্য থাকায় একই কাজ করছেন। এতে প্রতিনিয়ত চড়া সুদের ফাঁদে পড়ছে সুবিধা নিতে আসা অসহায় মানুষ। রাজশাহীর বাঘা উপজেলা সদর সহ বেশ কিছু গ্রামে এমন চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। অনেকেই এখন সুদের টাকা দিতে না পেরে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পাওয়া গেছে দাদন ব্যবসারনানা তথ্য। বাউসা মাঝপাড়া গ্রামে রয়েছে “মাঝপাড়া উন্নয়ন সংস্থা”। আড়ানীতে রয়েছে “বন্ধন সমবায় সমিতি”। এ রকম নামকাওয়াস্তে আরো অনেক সমিতি লক্ষ্য করা গেছে বিভিন্ন এলাকায়। এদের কাজ হচ্ছে গ্রামের অভাবগ্রস্থ কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের চড়া সুদে ঋণ দেয়া। বিনিময়ে ফাঁকা চেক এবং ফাঁকা ষ্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে থাকেন তারা।

বাঘার আমোদপুর গ্রামের স্কুল শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক জানান, সাধারণ মানুষ ব্যাংক লোন নিতে গেলে তাদেরকে জমির কাগজ জমা দিতে হয়। এদিক থেকে গ্রামের কোন প্রভাবশালী দাদন ব্যবসায়ী কিংবা সমিতি থেকে ঋণ নিতে জমির কাগজ জমা দিতে হয় না। তাই তারা এ সমস্ত জায়গা থেকে লোন নিয়ে থাকেন। এদের মধ্যে অনেকেই সুদের টাকা দিতে না পেরে বাড়ি-ঘর ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

সূত্র মতে, প্রতিটি সমিতি ২০ থেকে ২৫ কিংবা তারও বেশি সদস্য নিয়ে গড়ে উঠেছে। এদের কেউ কেউ উপজেলা সমাজসেবা অফিস কিংবা ও সমবায় অফিস নিবন্ধন নিলেও বেশিরভাগই বিনা অনুমতিতে সমিতি পরিচালনা করছেন। পক্ষান্তরে সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তিরা এসব দাদন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তারা লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে গ্রামের কৃষক, শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাঝে শতকরা ১৫ টাকা মাসিক সুদে ঋণ দিয়ে থাকেন। এরপর নির্দিষ্ট লোকের মাধ্যমে তারা প্রতি সপ্তাহে অথবা মাসিক কিস্তিতে শুধু ঋণের বিপরীতে সুদের টাকা আদায় করেন। আর কোনো গ্রহীতা সুদের টাকা দিতে ব্যর্থ হলে বাড়ি থেকে গরু-ছাগল নিয়ে যাওয়াসহ জোরপূর্বক জমি দখল করা হচ্ছে। এতে সর্বশান্ত হচ্ছে অসহায় মানুষ।

উপজেলার হেদাতিপাড়া গ্রামের সৌরভ জানান, এ রকম চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, মাত্র দুই হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তাকে এক বছরের মাথায় গুনতে হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। একই অভিযোগ করেন দীঘা এলাকার আলমগীর হোসেন, পীরগাছা গ্রামের মাসুদ রানা ও আমোদপুর গ্রামের লালন উদ্দিন। তাদের মতে, যারা সুদের ব্যবসা করে তাদের বাড়িতে যদি প্রশাসন তল্লাশি চালায় তাহলে প্রত্যেকের বাড়িতে অসংখ্য ফাঁকা চেক এবং ষ্ট্যাম্প পাবে।

উপজেলার তেপুখুরিয়া গ্রামের শিক্ষক আবু সাইদ বৃটেনের স্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, এক বছর আগে ইউপি নির্বাচনের সময় আমি ভোটে দাঁড়াই। এ সময় আমার স্বামী স্থানীয় দুই প্রভাবশালী দাদন ব্যবসায়ীর নিকট থেকে সুদের উপর ৩ লাখ টাকা নেন। বর্তমানে সুদ-সহ তাদের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। একইভাবে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন চন্ডিপুর এলাকার সাজেদুল ইসলাম সহ আরো অনেকে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিন রেজা বলেন, এ ধরণের দাদন কিংবা সুদ ব্যবসায়ীর কোন তথ্য বা অভিযোগ তার কাছে নেই। তবে সমিতির নামে কেউ যদি উচ্চ সুদে ঋণ দিয়ে ব্যবসা চালায়, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বাংলার কথা/নুরুজ্জামান/অক্টোবর ১৬, ২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
%d bloggers like this: