আজ- শনিবার, ১৫ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৩রা শাওয়াল, ১৪৪২ হিজরি
বাংলার কথা
Header Banner

বাগমারায় সামাজিক অবক্ষয়ে বাড়ছে অপরাধ

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp

মাহফুজুর রহমান প্রিন্স, বাগমারা (রাজশাহী) ০
রাজশাহী জেলার বৃহত্তম উপজেলা বাগমারায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া এখানে প্রতিপক্ষের প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলছে একের পর এক পানবরজ। সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে এসব অপরাধ বাড়ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

 

সম্প্রতি আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি দেখা দিয়েছে এ উপজেলায়। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর চরম অবহেলা ও গাফিলতির কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পূর্ব শত্রুতার জের ধরে পান বরজে অগ্নি সংযোগ, স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন, সৎ মায়ের হাতে শিশু সন্তান হত্যা সহ প্রতিনিয়ত ধর্ষণ, চুরি, মাদকের বিস্তার, হামলা, ভাংচুর, সংঘর্ষ ও জমি দখলসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ড সংঘটিত হচ্ছে। এতে জনমনে চরম আতংক ও উৎকন্ঠা বিরাজ করছে।

 

বাগমারা থানার দেওয়া তথ্য মতে, বাগমারায় দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে গত দু’দিনে তিন কৃষকের পান বরজ পুড়ে ভষ্মীভূত হয়ে গেছে। গত বুধবার রাতের পর আবারো গনিপুর এলাকায় মকছেদ আলী নামের এক কৃষকের পান বরজ পূর্ব শত্রুতার জের ধরে আগুনে পুড়িয়েছে প্রতিপক্ষরা। এ নিয়ে এলাকায় পান বরজ চাষিরা আগুন আতঙ্কে রয়েছেন।

 

গত বুধবার দিবাগত রাতে ওই এলাকায় পূর্বশত্রুতার জের ধরে আয়েন উদ্দীন নামের এক কৃষকের পান বরজে আগুন দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় কৃষকের পান বরজের পাশে আরো একটি পান বরজ পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে গেছে। এতে করে আয়েন উদ্দীনের প্রায় চার লাখ ও পাশের পান বরজ কৃষক সাইদের দুই লাখ টাকার ক্ষতি সাধিত হয়েছে।

 

এর পর আবারো বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে একই ইউনিয়নের বাসুবোয়ালিয়া গ্রামে মকছেদ আলী নামের কৃষকের পান বরজে পূর্বশত্রুতার জের ধরে প্রতিপক্ষ আগুন লাগিয়ে দেয়। এতে করে মকছেদ আলীর এক বিঘা জমিতে থাকা পানের বরজ পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। আগুনে পান বরজ পুড়ে গিয়ে প্রায় সাত লাখ টাকার ক্ষতি সাধিত হয়েছে। একের পর এক পানবরজ ভস্মীভূত ঘটনায় এলাকায় হাহাকার রুপ ধারণ করেছে।

 

এর আগে গত বৃহস্পতিবার বাগমারায় এক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। ওই শিশুর নাম মারুফ হাসান (৭)। সে উপজেলার শুভডাঙ্গা ইউনিয়নের বিনোদপুর গ্রামের শাহজাহান আলীর ছেলে। মৃত্যু বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শিশুটির বাবা ও সৎ মাকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শিশুটিকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যার কথা স্বীকার করে শিশুটির মৎ মা মুক্তা বেগম।

 

পুলিশ ও এলাকাবাসি সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সকালে শিশু মারুফ হাসানকে বাড়িতে সৎ মায়ের কাছে রেখে তার বাবা শাহজাহান আলী কাজের জন্য বাইরে যান। পরে নির্জন ঘরে শিশুটিকে নিয়ে গিয়ে সৎ মা মুক্তা বেগম তাকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে বলে প্রতিবেশিরা জানান।

 

ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে মা মারুফা বেগমও বাবার বাড়ি থেকে ছুটে আসেন। ছেলেকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুর লাশের সুরাতহাল প্রতিবেদন প্রস্তত করে। ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

এর আগে গত ২২ এপ্রিল প্রতিপক্ষরা হামলা চালিয়ে স্কুল ছাত্র ছেলের সামনেই পিতাকে কুপিয়ে খুন করে বীরদর্পে চলে যেতে সক্ষম হয়। জানা গেছে, ওই দিন বিকেলে গনিপুর ইউনিয়নের মাধাইমুড়ি গ্রামের কৃষক হাবিল কাজী (৪৪) পানবরজের কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিলেন। সাথে ছিল তার স্কুলপড়ুয়া ছেলে শওকত হোসেন (১৪)। এ সময় প্রতিপক্ষরা জমি সংক্রান্ত পূর্ব শত্রুতার জের ধরে হাবিল কাজীর উপর হামলা করে তাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা নিশ্চিত করে বীরদর্পে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

 

ওই ঘটনায় নারী সহ আরো ১০জন মারাত্মক আহত হলে তাদেরকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনার আরো দুই দিন আগে টিপু সুলতান (২৮) নামে এক পান ব্যবসায়ীক তুলে যায় দুর্বত্তরা। প্লাস দিয়ে টিপুর হাত ও পায়ের নখ তুলে ফেলে এবং টিপুর কাছে থাকা তিন লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। ওই ঘটনায় টিপু বাগমারা থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে। পরে ওই ঘটনা বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে পুলিশ পান ব্যবসায়ী টিপুর এজাহার আমলে নিয়ে পাঁচ আসামীকে গ্রেপ্তার করে।

 

এর কিছু দিন আগে উপডজেলা বিহানলী এলাকার বিলসৌতি বিল এলাকায় বিলের দখল ও মাছ চাষ নিয়ে প্রতিপক্ষরা অ্যাকসন, আ্যাকসন বলে সাবেক ইউপি সদস্য আজাহার আলীর পাঁচটি সেচ যন্ত্রে অগ্নিসংযোগ করে তা পুড়িয়ে দেয়া হয়। এরও একদিন আগে পূর্বশত্রুতার জের ধরে গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের সমসপাড়া গ্রামে আনিছুর রহমান (৪২) নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে প্রতিপক্ষরা। পরে প্রতিবেশিরা তাকে উদ্ধার করে বাগমারা উপজেলা স্বাস্ত্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে তার অবস্থার অবনিত হলে আনিছুর রহমানকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। এখনও তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় আনিছারের মা ফাতেমা বেগম বাদী হয়ে ছেলেকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগ এনে বাগমারা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

 

সর্বশেষ গত ২৯ এপ্রিল ভালবেসে বিয়ে করে মাত্র দেড় মাসের মাথায় পাষন্ড স্বামীর হাতে খুন হন গৃহবধু সাবিনা খাতুন (২৩)। এ ঘটনায় পুলিশ লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠিয়েছে এবং হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে স্বামী সোহাগ হোসেন (১৮) ও শাশুড়ি রূপালী বেগমকে (৩৫) আটক করেছে।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার চানপাড়া গ্রামের কলেজ পড়ুয়া সোহাগ হোসেনের সাথে মাঝগ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা নারী সাবিনা ইয়াসমীনের মুঠোফোনের মাধ্যমে পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। গত দেড় মাস আগে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রতিবেশিরা জানান, গত শুক্রবার রাতে সাহরী খাওয়ার সময় স্বামী স্ত্রীর মধ্যে তীব্র বাকবিতন্ডা হয়। পরে সকালে প্রতিবেশিরা গৃহবধূ সাবিনা খাতুনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানতে পারে।

 

এ ঘটনায় গৃহবধূর মা ছামেনা বিবি অভিযোগ করেন , স্বামী ও শাশুড়ি তার মেয়েকে গলা টিপে হত্যা করেছে। বিয়ের পর থেকে তারা তাকে মেনে নিতে পারেনি। এ ঘটনায় ছামেনা বিবি বাদি হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এ ঘটনায় পুলিশ সন্দেহমূলকভাবে স্বামী সোহাগ হোসেনকে আটক করে। পরে থানায় গিয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহাগ তার স্ত্রীকে বালিণ চাপা দিয়ে হত্যার কথা স্বীকার করে।

 

এ ঘটনার কিছুদিন আগে হাটগাঙ্গোপাড়া এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তার প্রতিবেশি এক গবীর শিশুকে (১০) খাবারের লোভ দেখিয়ে নিজ বাড়িতে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে। পরে ওই ঘটনায় থানায় মামলা হলে অভিযুক্ত শিক্ষক পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ তাকে আটক করলে তিনি ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন।

 

এভাবে মোহনপুর এলাকা ও গনিপুর এলাকায় পর পর আরো দুটি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। তবে সব ঘটনাতেই পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে। তারপরও থামছে না ধর্ষণের ঘটনা। এতে সচেতন ও অভিভাবক মহলে বাড়ছে চরম উৎকন্ঠা ।

 

এদিকে, বাগমারা উপজেলা যেন আবারও মাদকের অভয়াশ্রমে পরিণত হতে চলেছে। গত মাসে বাসুপাড়া ইউনিয়ন কৃষকলীগের সভাপতি মাহাবুর রহমানের পেঁয়াজ ক্ষেতে গাঁজা চাষের অপরাধে ৩০ মন গাঁজার গাছ সহ মাহাবুরের ছেলে সাগরকে আটক করে। পরে এ ঘটনায় উপজেলা কৃষকলীগ থেকে মাহাবুরকে বহিস্কার করা হয়।

 

এর আগে ভবানীগঞ্জ বাজার থেকে ১২ বোতল ফেনসিডিলসহ সাত মাদকসেবিকে আটক করে র‌্যাব। তারপরও থেকে নেই ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন, চোলাই মদ সহ স্থানীয় হোমিওপ্যাথিক দোকানগুলোতে রমরমা রেকটিফাইট ইস্পিরিটের ব্যবসা। স্থানীয়রা জানান, পুরাতন মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকে জামিনে এসে আবারও শুরু করেছে মাদকের রমরমা বাণিজ্য। এমনি এক চিহ্নিত মাদক সম্রাজ্ঞি জুলেখা বেগম।

 

বাগমারা থানার ওসি মোস্তাক আহম্মেদ জানান, এই জুলেখা বেগমের বিরুদ্ধে প্রায় এক ডজন মাদকের মামলা চলমান রয়েছে। তিনি জামিনে এসে আবারও পুরোনো স্টাইলে মাদকের ব্যবসা শুরু করেন। এই ব্যবসাকে নির্বিঘ্ন করতে জুলেখা তার নাতির বয়সী স্থানীয় এক নেতার ভাগিনাকে বিয়ে করে তার প্রভাব খাটিয়ে এখন দেদারছে ফেনসিডিল ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সোনাডাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আজাহারুল হক, যোগিপাড়ার কামাল হোসেন, গোবিন্দপাড়ার বিজন সরকার, নরদাশের আব্দুল মতিন, গনিপুরের অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান রঞ্জু ও একই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ অভিযোগ করে বলেন, সম্প্রতি বাগমারায় আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিনিয়তই বিভিন্ন ধরণের অপরাধমূলক কর্মকান্ড সংঘটিত হচ্ছে। অথচ এসব অনাকাঙ্খিত ঘটনার কোনো প্রতিকার হচ্ছে না।

এলাকার আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার স্বার্থে পুলিশ প্রশাসনের আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন বলে বাগমারা উপজেলা চেয়ারম্যান অনিল কুমার সরকার মনে করেন। তিনি বলেন, এ সব বিষয়ে এমপি সাহেবকে প্রতিনিয়ত অবহিত করা হচ্ছে। তিনিও বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আগামী ৭ মে তিনি বাগমারায় আসবেন। তখন এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে এবং সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

 

বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাক আহম্মেদ বলেন, ১৬টি ইউনিয়ন ও দুইটি পৌরসভার সমন্বয়ে গঠিত এ উপজেলায় সাড়ে চার লক্ষাধিক লোকের বাস। বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশকে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হয়। কাজেই এখানে বিচ্ছিন্নভাবে দুই একটি অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটতে পারে। এই করোনা মহামারিতেও পুলিশ এসব অনাকাঙ্খিত ঘটনা নিয়ন্ত্রণে দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছে।

 

বাগমারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরিফ আহম্মেদ জানান, সার্বিকভাবে আমাদের সামাজিক নানা ক্ষেত্রে বিভিন্ন কারণে অবক্ষয় ঘটেছে। তুচ্ছ কারণে পানবরজে অগ্নিকান্ড এটাই তার প্রমাণ। এসব থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের আরো ভূমিকা নিতে হবে। জেলা প্রশাসনকে বিষয়গুলো অবগত করা হয়েছে। দ্রুত এসব অনাকাঙ্খিত ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

বাংলার কথা/মে ০২, ২০২১

এই রকম আরও খবর

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn