বাগমারায় বন্যার পানি না নামায় দুর্ভোগে অসহায় মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক, বাগামারা (রাজশাহী) o
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বন্যার পানিতে গত চব্বিশ ঘন্টায় নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

উপজেলার বড়বিহারী ও কাচারীকোয়ালীপাড়া ইউনিয়নের অন্তত ৫০ টি গ্রাম এখন বন্যার পানিতে ভাসছে। এসব বানের পানি সহজে নামছে না। যত্রতত্র পুকুর দিঘী খনন ও বিভিন্ন স্থানের ব্রীজ কালভাটের মুখ বন্ধ করায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয় সচেতন মহল জানান। এছাড়া বন্যায় আক্রান্ত কাচারীকোয়ালীপাড়া ও বড়বিহানালী ইউনিয়নের অন্তত দুইশত কাঁচা বাড়িঘর ধ্বসে পড়ে গেছে বলে জানা গেছে।

এসব ইউনিয়নের শত শত লোকজন ত্রানের জন্য অধীর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। মিলছে না কাঙ্খিত ত্রাণ। ভুক্তভোগিরা বলছেন, সবাই আসছেন বন্যা দেখতে। আসছেন নেতা-নেত্রীরা , সাংবাদিকরা ও জনপ্রতিনিধি। সবাই তাদের দু:খ দূর্দশা দেখে শুধুই আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে যৎসামান্য ত্রাণ নিয়ে এসে শুধুই ফটো সেশন করে সেগুলো মিডিয়ায় প্রচারের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বন্যা প্লাবিত ইউনয়নের মুরারিপাড়া, কুলিবাড়ি, আমবাড়িয়া, মন্দিয়াল, কোহিতপাড়া, বড়বিহানালী পুর্বকান্দিসহ অনেক গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। এলাকা ভিত্তিক বিভিন্ন বাঁধ ভেঙ্গে তলিয়ে যাওয়ায় পরিবার পরিজন ও গৃহপালিত পশু নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে এলাকার লোকজন। কাঁচা পাকা সড়ক ডুবে গেছে পানিতে। দিশেহারা হয়ে পড়েছে বানভাসীরা। তারা ত্রানের জন্য অপেক্ষর প্রহর গুনছে। মিলছে না কাঙ্খিত ত্রাণ।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের ১৩টি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে কম বেশী ভাসলেও সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বড়বিহানালী, দ্বীপপুর, কাচারীকোয়ালীপাড়া ও ঝিকরা ইউনিয়ন । এসব ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। লোকজন চরম দূর্বিসহ জীবন যাপন করছে। পানি বন্ধি হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক মানুষ। ইউনিয়ন গুলোতে বন্যার পানি ঢোকার কারনে সহস্রাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি হুমকির মাঝে রয়েছে। অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও উঁচু জায়গাতে। কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের উপজেলা সদরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পড়েছে। বন্যায় কাচারীকোয়ালীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স প্লাবিত হয়েছে।

কাচারী কোয়ালীপাড়া, সোনাডাঙ্গা, গোবিন্দপাড়া, দ্বীপপুর, বড়বিহানালী, ঝিকরা, যোগীপাড়া, গনিপুর, বাসুপাড়া শুভডাঙ্গা, যোগীপাড়া ইউনিয়ন ও ভবানীগঞ্জ পৌরসভা এলাকায় নতুন ভাবে বন্যার পানি প্রবেশ করায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে গেছে। নতুন নুতন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় মানুষের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। পরিবার পরিজন নিয়ে রান্নার জায়গা না থাকায় অনেকেই খাদ্য সংকটে ভুগছেন বলে জানা গেছে। এবারের বন্যায় কি পরিমান ক্ষতি হয়েছে তা এখনো জানাতে পারেননি উপজেলা প্রশাসন। তবে দুই এক দিনের মধ্যে ক্ষতির পরিমান জানা যাবে বলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানা গেছে। বন্যায় উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুই পৌরসভার মধ্যে ১৩ টি ইউনিয়নের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ ধান পানির নীচে ডুবে গেছে। এছাড়াও পুকুর ও বিলের চাষ করা কয়েক হাজার কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। পানবরজ ও সবজি ক্ষেতের অপরিমাণ যোগ্য ক্ষতিসাধন হয়েছে বলে কৃষকরা জানিয়েছেন।

এলাকার বানভাসিদের অভিযোগ বন্যার পানি বাড়িতে ঢোকার পরেও উপজেলা প্রশাসন বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি তাদের খোঁজখবর নেয়নি। তারা রান্নার অভাবে অনেকেই অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন বলে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।

এ দিকে বাগমারার বন্যার পরিস্থিতি চরম আকার ধারন করায় বৃহস্পতিবার থেকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শন ও বানভাসী মানুষদের মাঝে ত্রান হিসাবে ১০ কেজি করে চাউল বিতরন শুরু করেছেন। এছাড়া সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাড. জাকিরুল ইসলাম সান্টু বড়বিহানালী ইউনিয়নের খালিশপুর বাজার মোড়ে দুই শতাধিক নারী পুরুষের মাঝে রান্না করা খাবার(খিচুরী ) বিতরণ করেছেন। তবে এসব্ ত্রাণ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন বন্যাক্রান্ত লোকজনেরা।

তারা বলেন, তারা এখন পুরোপুরি পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। নৌকার অভাবে কোথায় যেতে পারছেন না। পরিবার পরিজন ও গৃহপালিত পশু নিয়ে তাদের এখন চরম বিপদ। তারা এক বেলা খেয়ে না খেয়ে কোন রকম দিন পার করছেন।

দ্বিপপুরের হাসানপুরের ফজলুর রহমান, বড়বিহানালীর মুরারীপাড়ার তোফাজ্জল হোসেন সহ বানভাসি ১৫/১৬ জন লোকেরা জানান, গত ৪/৫ দিন ধরে তারা পানিবন্দী। আয় ইনকামের সকল পথ বন্ধ। এক বেলা খেয়ে কোন রকমে দিন পার করছেন। ধান সবজি ও পানবরজ মিলে তাদের সবকিছু বানে ভেসে গেছে।

বড়বিহানালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান মিলন জানান, গত কয়েকদিনের বর্ষণ ও বন্যায় ইউনিনের সবগুলো গ্রামই প্লাবিত হয়েছে। এই ইউনিয়নের সাড়ে চার হাজার পরিবারের মধ্যে প্রায় চার হাজার পরিবারই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

কাচারীকোয়ালীপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান আয়েন উদ্দিন জানান, তার ইউনিয়নের ১০ টি গ্রাম বন্যার পানিতে ভাসছে। এখানে শতাধিক পানবরজ তলিয়ে গেছে। লোকজন রাস্তার উপর গরু ছাগল নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। বানভাসি মানুষের জন্য ব্যাপক ত্রাণ সহায়তা দরকার। বিষয়টি তিনি ইউএনও কে জানিয়েছেন।

এ দিকে বন্যার পানি খুব ধীর গতিতে নামায় বাগমারায় বানভাসি মানুষের দূভোগ সহসা লাঘব হচ্ছে না। স্থানীয়রা বলছেন, বিগত এক বছরে বাগমাারায় অন্তত পাঁচ হাজারের বেশি পুকুর দিঘী খনন করা হয়েছে অপরিকল্পিত ভাবে। এছাড়া বিভিন্ন খাল বিলের মুখ বন্ধ করে মাছ চাষ করছে কতিপয় অসাধু মৎস চাষিরা। ছোট খাত ডারার পানি প্রবাহ বন্ধ করেও মাছ চাষ করছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। ফলে পানির স্বাভাবিক গতি প্রবাহ বন্ধ হয়ে বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার রাজিবুর রহমান জানান, এ মুহুর্তে নদী খুব ফুলে ফেঁপে আছে । সে কারণে বন্যার পানি সহজে নামতে পারছে না। তবে সব গুলো স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। আশা করি পানি দ্রুতই নেমে যাবে।

এ দিকে ত্রাণ সংকট ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফ আহম্মেদ জানান, ক্ষতির পরিমান নির্ধারনের জন্য স্ব স্ব দপ্তরের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরীর জন্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দুই এক দিনের মধ্যেই ক্ষতির পরিমাণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রনয়নের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগগ্রস্তদের সরকারী ভাবে সহযোগীতা করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

বাংলার কথা/মাহফুজুর রহমান প্রিন্স/অক্টোবর ০২, ২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
%d bloggers like this: