আজ- শুক্রবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৪ই রজব, ১৪৪২ হিজরি
বাংলার কথা
Header Banner

বাংলাদেশে যেভাবে কাজ করে এনআইডি জালিয়াত চক্র

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp


বাংলার কথা ডেস্ক ০
সম্প্রতি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের বাংলা ভাষার পরিষেবা বিবিসি বাংলা`য় ‘বাংলাদেশে যেভাবে কাজ করে এনআইডি জালিয়াত চক্র’ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদক মুন্নী আক্তারের সেই প্রতিবেদনটি  হুবহু তুলে ধরা হলো-
বাংলাদেশে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি অপরাধের ক্ষেত্রে নকল জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করার উল্লেখ পাওয়া যায়। যা নিয়ে বেশ আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যে রোববার(১৩ই সেপ্টেম্বর) রাজধানী ঢাকার মিরপুর থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি চক্রের ৫ জনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ডিবি। এদের মধ্যে রয়েছেন দুই জন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, দুই জন দালালচক্রের সদস্য এবং একজন যিনি জাল পরিচয়পত্র তৈরি করিয়েছেন।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম জানান, ভুয়া এনআইডি তৈরি করে তারা ব্যাংক ঋণ গ্রহীতাদের সহযোগিতা করতো।
নকল পরিচয়পত্র তৈরি করে যাদের ঋণ দরকার কিন্তু আগের রেকর্ড খারাপ আছে, লোন হচ্ছে না নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে তাদের দেয়া হতো। তারা নতুন আইডি কার্ড ব্যবহার করে লোন নিতো বলে জানান মি. আলম।
এদের বিরুদ্ধে মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা করা হয়েছে।
গত ১১ই সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ায় জাতীয় পরিচয়পত্র জাল করে অন্যের জমি বিক্রি করে দেয়ার চেষ্টায় জড়িত ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

কুষ্টিয়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান তালুকদার বলেন, এদের মধ্যে তিন জন রিমান্ডে রয়েছে।

চলতি বছরের জুলাই মাসে ভুয়া করোনা প্রতিবেদন দেয়ার মামলায় গ্রেফতার জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর কাছ থেকেও একাধিক এনআইডি কার্ড উদ্ধার করা হয়।

এর আগে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয় পত্র পাইয়ে দেয়ার অভিযোগে ২০১৯ সালে চট্টগ্রামে একটি মামলা হয়।

ওই মামলায় মোট ১৩ জনকে গ্রেফতার করে চট্টগ্রামের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। যাদের মধ্যে স্থানীয় নির্বাচন কমিশনের কয়েক জন কর্মকর্তাও রয়েছেন।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজমের এডিসি পলাশ কান্তি নাথ বলেন, মামলাটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। গ্রেফতার হওয়া ১৩ জনের মধ্যে তিন জন জামিনে রয়েছেন।

এদের মধ্যে চট্টগ্রামে নির্বাচন কমিশনের আঞ্চলিক দপ্তরের বেশ কয়েক জন কর্মকর্তাও রয়েছেন।

এনআইডি কী কাজে লাগে?

বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য এবং বিভিন্ন ধরণের নাগরিক সুবিধা পাওয়ার জন্য এনআইডি কার্ড বা জাতীয় পরিচয়পত্র দরকার হয়।

মোট ২২ ধরণের কাজের ক্ষেত্রে এনআইডি কার্ড ব্যবহার করা হয়।

যার মধ্যে সরকারি সব অনলাইন সুবিধা, ড্রাইভিং লাইসেন্স করা ও নবায়ন, পাসপোর্ট করা ও নবায়ন, সম্পত্তি কেনাবেচা, আয়করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন প্রাপ্তি, বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রেশন, ই-পাসপোর্ট, ব্যাংক হিসাব খোলা, ব্যাংক ঋণগ্রহণ, সরকারি ভাতা উত্তোলন, সহায়তা প্রাপ্তি, বিআইএন, শেয়ার-বিও একাউন্ট, ট্রেড লাইসেন্স, যানবাহন রেজিস্ট্রেশন, বীমা স্কিম, ই-গভর্নেন্স, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, মোবাইল সংযোগ, হেলথ কার্ড, ই ক্যাশ, ব্যাংক লেনদেন ও শিক্ষার্থীদের ভর্তির কাজ ছাড়াও আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাজ।

সম্প্রতি রেলের টিকেট কাটার জন্যও জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

কীভাবে কাজ করে জালিয়াত চক্র?

নকল জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি তৈরি করার পেছনে বিভিন্ন পর্যায়ে একটি সুসংগঠিত চক্র কাজ করে বলে জানায় পুলিশ।

এই চক্র যাদের এনআইডি কার্ড দরকার তাদের সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে তথ্য প্রবেশ করানোর পর্যন্ত সব পর্যায়ে লোকজন রয়েছে বলে জানা যায়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম জানান, এ পর্যন্ত তদন্তে তারা যা জানতে পেরেছেন তা হচ্ছে, ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের মাধ্যমে পুরো কাজটি করা হয়ে থাকে।

“ডাটা এন্ট্রি অপারেটর অনলাইনে এনআইডি কার্ডের ফর্ম পূরণ করে দেয়। এদের অগাধ ক্ষমতা এন্ট্রি দেয়ার। কারণ এরা যা এন্ট্রি দেয় সেটাই ফাইনাল।”

তিনি বলেন, গ্রেফতার হওয়া ডাটা এন্ট্রি অপারেটররা নির্বাচন কমিশনে আউটসোর্সিংয়ের কাজে নিয়োজিত এমন প্রতিষ্ঠানের কর্মী। ফলে এ কাজটি তাদের জন্য কোন সমস্যাই নয়।

একই ব্যক্তির একাধিক এনআইডি থাকলে সেটির নোটিফিকেশন আসতে একবছরের মতো সময় লাগে। এই এক বছরের মধ্যে জালিয়াত চক্রের উদ্দেশ্য সফল হয়ে যায় বলে জানান মি. আলম।

“যদি ডাবল এন্ট্রির কারণে ভবিষ্যতে কোন নোটিফিকেশন আসে তো সেটি ঝুলে থাকে। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত আসতে এক বছর লাগে। সেক্ষেত্রে কোনটি বাতিল হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অনেক সময় বাতিলও করা হয় না।”

তিনি বলেন, গ্রেফতার হওয়ারা জানিয়েছেন, এই এক বছরের মধ্যে তারা কয়েক’শ নকল এনআইডি বানিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়ার টার্গেটে ছিল। এর পর তারা ডাটা এন্ট্রির চাকরি ছেড়ে দিতো যাতে কেউ ধরতে না পারে।

জাল এনআইডি তৈরির চক্রের বিষয়ে চট্টগ্রাম পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগের এডিসি পলাশ কান্তি নাথ বলেন, “এই চক্রটি কিভাবে কাজ করে সেটা এক কথায় বলা সম্ভব নয়। তবে তদন্ত থেকে যা পাওয়া যায় তা হচ্ছে, তারা স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয় পত্রের জন্য প্রথম যে উপকরণ সেটি হচ্ছে জন্ম সনদ, সেটি আগে সংগ্রহ করে।”

এই কাজের জন্য তাদের আলাদা চ্যানেল বা সোর্স থাকে। যাদের মাধ্যমে এনআইডি কার্ড তৈরির কাজগুলো তারা পেয়ে থাকে বলে জানানো হয়।

“এর পর চক্রের মাধ্যমে ভোটার আইডি কার্ডের ফর্ম পূরণ করে সেই তথ্য সার্ভারে আপলোড করে। এর পর যাচাই বাছাইয়ের পর চক্রটি ঠিক ঠাক কাজ করতে পারলে এনআইডি কার্ড পেয়ে যেতো।”

মি. নাথ বলেন, চট্টগ্রাম থেকে যে চক্রটি গ্রেফতার করা হয়েছিল তাদের মধ্যে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কাজ করে এমন সদস্যও রয়েছে। তারাই সার্ভারে তথ্য আপলোড দেয়ার কাজ করতো।

তবে এ ধরণের ঘটনা শুধু চট্টগ্রামে নয় বরং ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে রয়েছে বলেও জানান তি. নাথ।

তিনি বলেন, “গতকাল বা পরশু ঢাকা থেকে ডাটা এন্ট্রি অপারেটরসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অর্থাৎ চিটাগাং-ঢাকা মিলে একটা চক্র তো আছেই।”

কী ব্যবস্থা নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন?

এনআইডি কার্ড বা জাতীয় পরিচয় পত্রের জালিয়াতি রুখতে এ সপ্তাহের শেষ থেকে শুরু হতে যাচ্ছে সাড়াশি অভিযান। এ-তথ্য জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “আমরা একটা সাড়াশি অভিযান চালাচ্ছি যাতে বিভিন্ন দিক থেকে যেমন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, দালালচক্র বা কমিশনের কেউ থাকলে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা যায়, সেজন্য বড় ধরণের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।”

এর জন্য সারা দেশে অঞ্চল ভিত্তিক ১০টি টিম গঠন করা হচ্ছে। এছাড়া রাজধানী ঢাকার জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে।

কোন ধরণের অনিয়ম পেলে সে যেই হোক না কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তবে এটি এখনো পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সাথে কথা বলে পরিকল্পনাটি চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে শুরু হবে বলে জানান মি. ইসলাম।

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের দুই কর্মকর্তাকে গ্রেফতারের ঘটনা উল্লেখ করে মি. ইসলাম বলেন, দুই জনের গ্রেফতারের বিষয়টি দেখেছেন। তাই একাজে যেই জড়িত থাকুক না কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

তিনি বলেন, “ওই দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠান এনআইডি কার্ড তৈরিতে আউট সোর্সিংয়ের কাজ করে থাকে তাদেরকেও নোটিশ দেয়া হয়েছে যে তারা কেন তাদের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।”

সূত্র:বিবিসি বাংলার।
বাংলার কথা/ অ.পা/ সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২০
 

 

এই রকম আরও খবর

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn