পদ্মার চরে হেনস্থার শিকার হচ্ছেন দর্শনার্থীরা

সাইফুল ইসলাম, রাবি ০

রাজশাহী শহরের কাল ঘেষে বয়ে চলা পদ্মা নদীর পানি প্রায় শুকিয়ে গেছে। নদীতে জেগে উঠেছে চর। পদ্মার চারদিক বিমোহিতকর নয়নাভিরাম দৃশ্যে ভরপুর। শহরের কোলাহল ছেড়ে মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াতে নগরবাসীর প্রিয় স্থান দিগন্ত বিস্তৃত পদ্মার চর। পদ্মার দুই পাড়েই দেখা মেলে বিনোদনপ্রেমীদের ভিড়। প্রতিদিন পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব মিলে নগরবাসী বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা আড্ডায় মেতে উঠেন প্রিয় এই পদ্মার চরে। পদ্মা পাড়ের মায়াবী সৌন্দর্যের মাঝে হারিয়ে যান তারা।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে পদ্মার চরে ছিনতাই, হয়রানি ও অপহরণের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী ছিনতাই ও অপহরণের শিকার হওয়ার ঘটনায় সম্প্রতি এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ভ্রমণে সতর্ক করে দিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে নগর পুলিশের উপকমিশনার (পশ্চিম) একেএম নাহিদুল ইসলাম বলেন, কেউ অযথা ঘুরতে গেলে তার নিরাপত্তা আমরা দিতে পারবো না। যারা অভিযোগ করেছে তাদের অফিসে নিয়ে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শহরের পাশেই অবস্থিত হওয়ায় পদ্মার চর রাজশাহীর অন্যতম পর্যটন স্পটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই পদ্মার ওপাড়ে চরে দেখা যায় বিনোদনপ্রেমীদের ভিড়। আর পদ্মার পাড়ের এই বিনোদনপ্রেমীদের একটা বড় অংশ হচ্ছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে পদ্মার চরে ঘুরতে গিয়ে প্রায়ই হেনস্থার শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এমনকি অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করার ঘটনাও ঘটেছে। চরে সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে। যারা ঘুরতে আসা শিক্ষার্থীদের মূল্যবান জিনিস ছিনতাই, মারধর, জিম্মি করে টাকা আদায়সহ বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত। দিন দিন অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম বেড়েই চলেছে। বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীচক্র সক্রিয় হয়ে উঠে। লোকজন কমে গেলেই ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধকর্মে লিপ্ত হয় তারা। অনেক সময় কম সংখ্যক লোক পেলে ভর দুপুরেও ঘটে ছিনতাইয়ের ঘটনা।

এছাড়া ছাত্রীদেরকে উত্যক্ত করার ঘটনা অহরহ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, অপরাধীরা প্রধানত টার্গেট করে দুই-তিনজন মিলে ঘুরতে আসা শিক্ষার্থীদের। সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তরা দেশীয় অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে লোকজনের সর্বস্ব কেড়ে নেয়। বুধবার (১০ মে) পদ্মার চরে ঘুরতে গিয়ে স্থানীয় দুর্বৃত্তদের খপ্পরে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় বর্ষের দুই শিক্ষার্থী। দুর্বৃত্তরা তাদের আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করে। পরে পুলিশ ও রাবি ছাত্রলীগের মধ্যস্থতায় উদ্ধার পায় ওই দুই শিক্ষার্থী। বিভিন্ন সময় ছিনতাই এর শিকার শিক্ষার্থীদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়। ফলে ভয়ে এসব ঘটনার কথা কাউকে জানান না শিক্ষার্থীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী বলেন, কয়েকদিন আগে বন্ধুদের সঙ্গে তারা পদ্মার চরে গিয়েছিলেন। এসময় দুজন বখাটে যুবক এসে তাদের সাথে থাকা বান্ধবীকে উদ্দেশ্য করে অশ্লীল কথা বলতে শুরু করে। এর প্রতিবাদ করলে বখাটেরা ক্ষেপে গিয়ে তাদের মারতে উদ্ধত হয়। পরে তারা একজনের পেটে ছুরি ধরে মানিব্যাগ ও মোবাইল কেড়ে নেয়।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পদ্মার চরে বেড়াতে গিয়ে দুর্বৃত্তদের কবলে পড়ে ছিনতাই, মারধর, জিম্মি হওয়াসহ নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার শিকার হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ‘নিরাপত্তার’ স্বার্থে চরে শিক্ষার্থীদের অনিরাপদ ভ্রমণে সতর্ক করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (১১ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রফেসর মু. এন্তাজুল হক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র-ছাত্রীরা পদ্মার চরে বেড়াতে গিয়ে দুর্বৃত্তদের দ্বারা ছিনতাই, মারধর, জিম্মি হওয়াসহ নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার শিকার হচ্ছে। এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালরে ছাত্র-ছাত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে পদ্মার চরে অনিরাপদ ভ্রমণ করা হতে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ দেওয়া হল।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ভাষা বিভাগের শিক্ষার্থী সুমন মোড়ল বলেন, শহরের পাশ ঘিরে নদী, নদীর চর। শিক্ষার্থীরা সেখানে কেন যেতে পারবেন না। ব্যাপারটা এভাবে না দেখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং স্থানীয় প্রশাসন যদি নিরাপত্তার জন্য যে হুমকি তা দূর করতে উদ্যোগী হয় সেটাই ভালো। পুলিশ অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই আর সমস্যা থাকে না।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রফেসর মু. এন্তাজুল হক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ছে তারা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক। তারা নিজেদের ভালো-মন্দ বোঝে। কিন্তু তারপরও ছেলেমেয়েরা পদ্মার চরে একা বা দুজন গিয়ে বিভিন্ন সময় হয়রানির শিকার হয়। আর এই বিজ্ঞপ্তিটা সেটা নিয়েই। সকলকে বিষয়টি নিয়ে সাবধান করা হয়েছে।’

বাংলার কথা/সাইফ/মে ২১, ২০১৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email