শুক্রবার , ২৫ নভেম্বর ২০২২ | ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯
  1. অর্থনীতি
  2. আন্তর্জাতিক
  3. খুলনা বিভাগ
  4. খেলাধুলা
  5. চট্টগ্রাম বিভাগ
  6. জাতীয়
  7. ঢাকা বিভাগ
  8. প্রচ্ছদ
  9. ফিচার
  10. বরিশাল বিভাগ
  11. বিনোদন
  12. মতামত
  13. ময়মনসিংহ বিভাগ
  14. রংপুর বিভাগ
  15. রাজনীতি

নদীর নাব্যতা সংকট, ভোগান্তিতে যমুনা পাড়ের মানুষ

প্রতিবেদক
BanglarKotha-বাংলারকথা
নভেম্বর ২৫, ২০২২ ৫:০০ অপরাহ্ণ

নিউজ ডেস্ক :
বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর নাব্যতা সংকটে পড়েছে। নাব্যতা সংকটে পড়ায় নদীর দুই পাড়ের মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে নদী পাড়াপাড়ে। নদী পাড়ের মানুষ চরে উৎপাদিত ফসল পরিবহনে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। খেয়াঘাটের পরিবর্তন হওয়ায় কয়েক কিলোমিটার পায়ে হেঁটে গিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে।

জানা যায়, ১৯৯৮ সালের পর থেকে যমুনার উজানে নদী ভরাট হয়ে চর জাগতে শুরু করে। এখন বঙ্গবন্ধু সেতুর উজানে সিরাজগঞ্জ থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত ২৩০ কি.মি. নদীতে ছোট বড় চরের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। নতুন আরো এক হাজার চর জেগে ওঠার অপেক্ষায় আছে। এক সময়ের প্রমত্তা যমুনা নদী এখন নাব্যতা হারিয়ে বিভিন্ন রুটে নৌ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যমুনার বুকে এখন ধূ ধূ বালু চর। মাইলের পর মাইল হেঁটে চরে বসবাসরত মানুষকে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতে হচ্ছে। যমুনা চড়ে শিক্ষার আলো, স্বাস্থ্য সেবা, সড়ক সেবাসহ প্রায় সব ধরনের নাগরিক সেবা বঞ্চিত বরাবরই এই মানুষগুলো। বালির মাঝেই চাষাবাদ এবং গরু ছাগল পালন এদের প্রধান পেশা। এখন অবশ্যই অনেক চরে মরিচ, আলু, বাদাম, গম, ভুট্টাসহ প্রায় সব রকমের ফসলের চাষ হয়। তার পরেও এই চারের কৃষিকরা বঞ্চিত কৃষি সেবা থেকেও। এসব বালুচরের কারণে বর্ষা মৌসুমেও নৌকা চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।

এছাড়াও উজান থেকে নেমে আসা সামান্য ঢলের পানিতেই নদী পরিপূর্ণ হয়ে নদীতে অকাল বন্যা দেখা দেয়। বন্যার পর পরেই নদীতে নতুন নতুন চর জেগে উঠায় নৌকা আর চলে না। ফলে উৎপাদিত কৃষি পণ্য সহজে বাজারজাত করা যায় না। আবার বিভিন্ন জরুরি প্রয়োজনে হাট-বাজার, অফিস আদালত, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজে সময়মত আসা তাদের জন্য দূরহ হয়ে পড়েছে। চরাঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা। নদী নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় চরে তাদের বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নদীতে চলছে না নৌকা আবার ধূ ধূ বালুতেও চলছে চলছে কোন যানবাহন। মাইলের পর মাইল তপ্ত বালুতে হেঁটে পথ চলতে হচ্ছে।
কথিত রয়েছে, ১৯৫৮ সাল থেকে যমুনায় নদী ভাঙন শুরু হয়। ১৯৭৭ সালের পর এই ভাঙন ভয়াবহ রূপ নেয়। ফলে বিভিন্ন সময়ে ডান তীরের ১০৫ টির বেশি গ্রাম নদীভাঙনের শিকার হয়ে সম্পূর্ণভাবে যমুনাগর্ভে বিলিন হয়ে যায়। ফলে এইসব অঞ্চলের উপর দিয়ে যমুনা নদী তার প্রবল স্রোতধারা নিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। তখন নদীর গতিপথের অবস্থান হয় ডানতীর ঘেঁসে।

১৯৭৭ সালে শুরু হয় নদী শাসনের কাজ। ১৯৮৬ সালে জেলার সারিয়াকান্দির প্রধান পয়েন্টে কালিতলায় একটি গ্রোয়েনবাঁধ নির্মিত হয়। এরপর ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু করে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে গ্রোয়েন বাঁধটির পুনঃনির্মাণ কাজ হয় এবং দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তোলা হয়। এছাড়া ধনুট সীমানা থেকে সারিয়াকান্দির হাটশেরপুর ইউনিয়নের হাসনাপাড়া বাজার পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৮ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত যমুনা নদীর ডানতীর সংরক্ষণের কাজ করা হয়। এর মধ্যে ১৩০ কোটি টাকা ব্যায়ে ২০০৬ সালে কালিতলা গ্রোয়েনবাঁধ থেকে পারতিত পরল পর্যন্ত ২০০০ মিটার এবং দেবডাঙা পয়েন্টে ১২০০ মিটার তীর সংরক্ষণ কাজ হয়েছে। ২০০৬ সালের পর পারতিত পরল থেকে হাসনাপাড়া পর্যন্ত তীর সংরক্ষণ কাজ হয়। এছাড়া ২০১৬ সালে রৌহাদহ থেকে মথুরাপাড়া পর্যন্ত ৬ কি. মি. তীর সংরক্ষণ কাজ হয় ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে। ফলে উজান থেকে বয়ে আসা পলিজমে উপজেলার চালুয়াবাড়ী, হাটশেরপুর, কাজলা, কর্নিবাড়ী এবং সারিয়াকান্দি সদরের মৌজায় বিশালাকার আয়তনের চরাভূমির সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, নদী শাসনের কাজগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য যমুনা নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করে এখন বাম তীর ঘেঁসে জামালপুরের সিমানার কাছাকাছি অবস্থান করছে।

যমুনা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে উপজেলার চারটি ইউনিয়নের মৌজার জমিগুলো পুনরায় জেগে উঠেছে। এসব জমিগুলোতে নানা ধরনের

কৃষি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে এসব অঞ্চলগুলো হতে নদীভাঙনের শিকার হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়া জনসাধারণ আবার পুনরায় নতুন করে এখানে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছেন।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, যমুনার মূল উৎপত্তি পাশের দেশ ভারতে। উৎপত্তিস্থল থেকে যখন পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করে তখন এর গতি থাকে অনেক। পানির গতির কারণে ভরতের অংশের মাটি বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন টন বাংলাদেশ অংশের নদীতে পরে। এর ফলে ক্রমান্বয়ে নদী ভরাট হতে থাকে। নদীর গভীরতা কমে বর্ষা মৌসুমে অল্প পানিতেই বন্যার সৃষ্টি হয়।

অন্যদিকে, ইউরিয়া সার ও অন্যান্য মালামাল বোঝাই নৌকা কালিতলা ঘাটে ভিড়ছে না। তবে এসব পণ্যবাহী নৌকা সদর থেকে ৩-৪ কিলোমিটার দূরে গজারিয়া ঘাটে ভিড়ছে। এতে সময় ও খরচ পড়ছে বেশি।

স্থানীয় চরবাসীরা জানায়, আগে এ যমুনা নদীর পথে নিয়মিত দেশের বিভিন্ন বন্দর থেকে তেল সারসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে জাহাজ চলাচল করায় এটা জাহাজ গড়ান নদী হিসাবে সবার কাছে পরিচিত রয়েছে। নদীর গভীরতা হারিয়ে যাওয়ায় আর কোন জাহাজ কার্গো উত্তর দিকে যাতায়াত করছে না। এখন নদীর এমন অবস্থা জাহাজ তো দূরের কথা পণ্য বোঝাই নৌকা নিয়ে হাটে ঘাটে যাওয়াই কঠিন।

সারিয়াকান্দি পৌরসভার বাসিন্দা আপেল মাহমুদ লাভলু জানান, শতবছর যাবৎ যমুনা নদীর ভাঙ্গনের ফলে সারিয়াকান্দি উপজেলার প্রায় চারটি ইউনিয়নের ১০৫টি গ্রাম বিলিন হয়ে গেছে। প্রয়াত সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নান নদী ভাঙ্গনরোধে কয়েকটি প্রকল্পের অনুমোদন নিয়ে আসেন। সেই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়ন হওয়ার পর সারিয়াকান্দির অংশে এখন তেমন নদী নেই। বড় বড় চর জেগে উঠেছে। তাই নদীর নাব্যতা আগের মত নেই।

কাজলা ইউনিয়নের চকরথিনাথ চরের হাসান আলী জানান, খরা মৌসুমে নদীতে পানি কম থাকলে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পায়ে হেঁটে বালু পথ পাড়ি দেয়া দুরূহ হয়ে পড়েছে। সারিয়াকান্দি সদরে আসতে আগে সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে আবার দুপুরের মধ্যেই বাড়ি ফেরা যেত। আর এখন সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে রাতের আগে বাড়ি ফেরা যায় না। একারণে আমরা সাত আট মাস ধরে সারিয়াকান্দি হাটে আসা যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।

নয়াপাড়া চরের আবুল হোসেন জানান, বাড়ির ঘাটে নৌকা ভিড়ায় আগে বাড়ি থেকেই স্কুলে লেখাপড়া করত। কিন্তু এখন অনেক পথ হেঁটে চর পাড়ি দিয়ে স্কুলে পৌঁছা কঠিন হয়ে পড়ায় ছাত্রছাত্রীদের অন্যের বাড়িতে রেখে পড়া শিখাতে হচ্ছে।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, বগুড়ায় যমুনা নদী খনন করে ৫ কিলোমিটারের মধ্যে এর নাব্যতা রাখা হবে। বাকি অংশের জমি উদ্ধার করে বসতবাড়ি, কৃষি ফসল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা হবে। এজন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করছে। শিগগিরই এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।

তিনি আরো জানান, যমুনার মূল উৎপত্তি পাশের দেশ ভারতে। উৎপত্তিস্থল থেকে যখন পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করে তখন এর গতি থাকে অনেক। পানির গতির কারণে ভারতের অংশের মাটি বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন টন আমাদের নদীতে পরে। এর ফলে ক্রমান্বয়ে নদী ভরাট হতে থাকে। বর্তমানে শুকনো মৌসুমে যমুনার বুকে অসংখ্য চর ভূমি জেগে ওঠায় নদীগুলো অসংখ্য শাখা প্রশাখায় পরিণত হয়েছে। জেগে উঠেছে এ অঞ্চলে হাজারও বালুচর। ফলে স্বাভাবিক সময় নৌরুটে যত সহজ যোগাযোগের পথ হয় শুকনো মৌসুমে নাব্যতা হারানোর ফলে ঘুরে যাতায়াত করতে হয় নৌকাগুলোকে।

সর্বশেষ - প্রচ্ছদ