ত্রিশ থেকে আশির দশক জীবন্ত হয়ে আছে আরশাদ আলী’র সমৃদ্ধ সংগ্রহশালায়

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp

বদরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি :

আরশাদ আলী। ত্রিশের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার গ্রামোফোন রেকর্ডসহ বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, রবি ঠাকুরের অজর কবিতা, কাজী নজরুলের অবিনাশী গানের একজন সমৃদ্ধ সংগ্রাহক। চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে তার এ সংগ্রহ এখন রীতিমতো ঈর্ষণীয় সংগ্রহশালায় পরিণত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ, বাংলাভাষা, মুক্তিযুদ্ধসহ প্রায় পনের হাজার বাংলা, উর্দু, হিন্দি গানের সম্ভারে আরশাদের এ সংগ্রহশালা দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে হয়ে উঠেছে অনন্য এক রিসোর্স সেন্টার। তাই এ সংগ্রহশালায় বসে নিজেরে হারায়ে খোঁজেন আরশাদ।

 

বলছি নাটোরের বাগাতিপাড়ার জামনগর গ্রামের বাসিন্দা আরশাদ আলী কথা। তিনি বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের একজন পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে অবসরে গেছে প্রায় দু’বছর আগে। নিখুঁত শব্দ আর মোহনীয় সুরে মুগ্ধ হওয়ার দিনগুলোতে একসময় কলের গানই ছিল গানকে ধরে রাখা এবং শোনার একমাত্র মাধ্যম। গানের মাস্টার ভয়েস বলতে কলের গান বা গ্রামোফোনকেই বোঝায়। আরশাদ আলী তার সংগ্রহশালায় বসে সত্তর দশকের কৈশোর-তারুণ্যের দূরন্ত দিনগুলোতে হারিয়ে গিয়ে বলেন, ‘ওই সময় গানই ছিল আমার প্রাণ। বেতারে বা বিয়ে বাড়িতে গ্রামোফোনে গান শুনলেই থমকে গেছি। কীভাবে একটি গ্রামোফোন বা রেকর্ড সংগ্রহ করা যায়, তা নিয়েই ভাবতাম। তখন গান শোনার প্রধান মাধ্যমই ছিলো বেতার যন্ত্র অথবা গ্রামোফোন।’

তিনি জানান, এক সময় বৃটিশ কোম্পানী ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ এর গ্রামোফোনে রেকর্ড চালাতে পুরনো দিনের ঘড়ির মত স্প্রিং, চাবি এবং বাজানোর জন্য লোহার পিন ব্যবহার করতে হতো। তখন ৭৮ আরপিএম এর দুই গানের একটা রেকর্ড (মাটির রেকর্ড) বাজাতে দুই-তিনবার চাবি দেয়া লাগতো এবং বারবার পিন চেঞ্জ করতে হতো। এরপর আসে বৈদ্যুতিক মোটরের সাহায্যে চলা গ্রমোফোন তথা রেকর্ড প্লেয়ার। এই রেকর্ড প্লেয়ারের জন্য উন্নত প্রযুক্তির প্লাস্টিক রেকর্ডের আরপিএম কমিয়ে ৪৫ এবং ৩৩ করা হয়। ফলে ৪৫ আরপিএম এর দুই গানের রেকর্ডকে এসপি বা শর্ট প্লে, চার গানের রেকর্ডকে ইপি বা এক্সটেন্ডেড প্লে এবং ৩৩ আরপিএম এর রেকর্ডকে একই সঙ্গে এসপি, ইপি বা এলপি (লং প্লে) রেকর্ড বলা হতো, যেখানে একটি রেকর্ডে দুই থেকে বারো বা ষোলটা পর্যন্ত গান থাকতো এবং একটি পিন দিয়েই অনেক রেকর্ড বাজানো যেতো।

 

বর্তমানে আরশাদ আলীর সংগ্রহে আছে, জাপান ও চায়নার দু’টো গ্রামোফোন রেকর্ড প্লেয়ার। রেকর্ড, থ্রি ব্যান্ড রেডিও ও ক্যাসেট বাজানোর সুবিধা থাকা জাপানী সানিও এবং ন্যাশনাল প্যানাসনিক কোম্পানীর দুটো ব্রীফকেস সিস্টেম থ্রি-ইন-ওয়ান। তবে ব্রীফকেস সিস্টেম থ্রি-ইন-ওয়ান এর একটি (ন্যাশনাল প্যানাসনিক) সম্প্রতি এক বন্ধু নিয়ে গেছে। ইদানিং বাজারে চীনে তৈরি গ্রামোফোন বা রেকর্ড প্লেয়ার পাওয়া গেলেও প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আশির দশক থেকে ক্যাসেট/সিডি/ডিভিডি’র রমরমা ব্যবসার দৌরাত্ম্যে ক্রম হ্রাস পেতে থাকে গ্রামোফোন রেকর্ডের ব্যবসা। বিভিন্ন ধরণের অত্যাধুনিক পোর্টেবল ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস, চিপস্, মেমোরিকার্ড ইত্যাদির মাধ্যমে গান মানুষের পকেটে স্থান করে নেয়। এতে যখন খুশি যেখানে খুশি ইচ্ছে করলেই মানুষ গান শুনতে পারছেন। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রতিযোগিতাময় বিশ্বে ঘরে বসে রেকর্ড উল্টে পাল্টে গান শোনার সময়ও নেই এখন মানুষের হাতে। ফলে বিশ্বব্যাপি হিজ মাস্টার ভয়েস, কলম্বিয়া, মেগাফোন, হিন্দুস্তান রেকর্ড, ইনরিকো এমনকি আমাদের দেশের ‘ঢাকা রেকর্ড’সহ বিভিন্ন রেকর্ড প্রস্তুতকারি কোম্পানীগুলো রেকর্ড উৎপাদন বন্ধ করে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। এসব গ্রামোফোনের প্রচলন বিশ্ব বাজারে এখন আর নেই বললেই চলে। তবে সীমিত পরিসরে ভারতে এখনো টিকে আছে বলে জানা গেছে।
‘কলের গানে গান শোনা নেশার মত টানে আমাকে’ বলেন আরশাদ। তার মতে, ‘কলের গানই হচ্ছে প্রকৃত গানের উৎসমূল। অতীতের সোনালী গানের দিনে হারিয়ে যেতে কলের গান তুলনাহীন’। সংগ্রাহক আরশাদ আলী কিছুটা আক্ষেপ করেই জানান, যথাযথ সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় তার অনেক রেকর্ড নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ৭৮ আরপিএম রেকর্ডগুলোর অবস্থা খুবই ভঙ্গুর। ইতোমধ্যে বেশ কিছু রেকর্ড ভেঙ্গেও গেছে। কিছু রেকর্ড বিক্রি করতে হয়েছে সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতার কারণে।

 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ভাষণের রেকর্ড এবং ‘জয় বাংলা’ ছবির জন্য রেকর্ডকৃত ‘জয় বাংলা বাংলার জয়, হবে হবে হবে নিশ্চয়’ গানটির রেকর্ড উত্তাল মার্চে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ‘পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম করপোরেশন’ এর ‘ঢাকা রেকর্ড’ কোম্পানী থেকে প্রকাশিত হয়। এরপর মুহুর্তেই হাজার হাজার কপি মুক্তিকামী বাঙ্গালীর সংগ্রহে চলে যায়। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণের রেকর্ড ‘জয় বাংলা’ শিরোনামে কোলকাতা থেকেও প্রকাশিত হয়। বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষণের ঢাকা ও কোলকাতা সংস্করণের রেকর্ডও আছে আরশাদের সংগ্রহে। রবীন্দ্র-নজরুলের স্বকণ্ঠে গান ও আবৃত্তির রেকর্ড আছে তার সংগ্রহে। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট প্রকাশিত স্বাধীন বাংলা বেতারের গানের অ্যালবাম (এলপি) ‘একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে’ আছে আরশাদের সংগ্রহে। আরো আছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরে প্রচারিত এবং কোলকাতা থেকে প্রকাশিত এমআর আখতার মুকুলের জনপ্রিয় ব্যঙ্গ ধারাবাহিক ‘চরমপত্র’র রেকর্ড। আছে আমি ‘খালিদের মা বলছি’ শিরোনামে মিষ্টি মেয়ে খ্যাত চিত্র নায়িকা কবরী’র কন্ঠে মর্মস্পর্শী সংলাপের দুর্লভ রেকর্ড। কোলকাতা থেকে প্রকাশিত মোঃ আব্দুল জব্বারের গাওয়া ‘আমার দেশের মান দেবোনা প্রাণ থাকিতে/ মুজিব বাইয়া যাওরে/ সাড়ে সাত কোটি মানুষের আজ একটি নাম মুজিবর/ শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কন্ঠ স্বরের ধ্বনী প্রতিধ্বনী (বাংলা ও ইংরেজী ভার্ষণ)/ মোদের এ বাংলা সোনার বাংলা/ দীপেন মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘না না না ইয়াহিয়া তুমি হত্যা যতোই করো না’ এবং পাকিস্তানী জান্তার চোখ ফাঁকি দিয়ে করাচিতে ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ কোম্পানীতে রেকর্ডকৃত ফিরোজা বেগম, সাবিনা ইয়াসমিন, আসাদুল হক ও সহশিল্পীদের কন্ঠে ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো’ গানটির দুর্লভ রেকর্ডটিও তার সংগ্রহে আছে। এছাড়াও আছে শুধু তবলা, হারমোনিয়াম, বাঁশি আর দোতরা’র সমন্বয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে রেকর্ডকৃত অধিকাংশ উদ্দীপনামূলক দেশাত্ববোধক গানের অডিও, যা অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ এবং রণাঙ্গনে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করতো। ভারতীয় উপমহাদেশের পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর ও আশির দশকের শিল্পমান সমৃদ্ধ প্রায় চার শতাধিক বাংলা, উর্দু ও হিন্দি সিনেমার সিডি বা ডিভিডি’ও আছে তার সংগ্রহে।

গান শোনার পাশাপাশি আরশাদ আলী নিজেও সংগীত এবং আবৃত্তি চর্চা করেন। এখন এই অবসর জীবনে তিনি নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি’র সঙ্গীত প্রশিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় ওই উপজেলার মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ‘কিশোর-কিশোরী ক্লাব’ এর শিক্ষার্থীদের গান শেখান আরশাদ। তিনি একজন সুক্ষè রুচিশীল অনুরাগী পাঠকও বটে। দেশ বিদেশের খ্যাতিম্যান লেখকদের উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা, আমাদের ভাষা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, ঐতিহাসিক ঘটনাবলী, আত্নচরিত, ধর্মগ্রন্থ, সাপ্তাহিক-মাসিক পত্র-পত্রিকাসহ তাঁর সংগ্রহে আছে অসংখ্য বাংলা গানের ব্যাকরণ, গবেষণা গ্রন্থ আর স্বরলিপি। বাসায় বিত্ত বৈভবের স্থুল প্রদর্শনীর লেশমাত্র নেই কোথাও। আছে ঐতিহ্য আর শিল্পকলার নান্দনিক ছোঁয়া সবখানে। ইতিহাস, ঐতিহ্য আর গানের উৎস সন্ধানে ভবিষ্যতে আরশাদ আলীর এই সংগ্রহশালা নতুন প্রজন্মের জন্য হয়ে উঠতে পারে শিল্পকলা তথা সাহিত্য-সংস্কৃতির বাতিঘর।

বাংলার কথা/আশরাফুজ্জামান বাবু/১৪ সেপ্টেম্বর/২০২১

এই রকম আরও খবর

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn