সোমবার , ২৬ ডিসেম্বর ২০২২ | ২০শে মাঘ, ১৪২৯
  1. অর্থনীতি
  2. আন্তর্জাতিক
  3. খুলনা বিভাগ
  4. খেলাধুলা
  5. চট্টগ্রাম বিভাগ
  6. জাতীয়
  7. ঢাকা বিভাগ
  8. প্রচ্ছদ
  9. ফিচার
  10. বরিশাল বিভাগ
  11. বিনোদন
  12. মতামত
  13. ময়মনসিংহ বিভাগ
  14. রংপুর বিভাগ
  15. রাজনীতি

জাতীয় মাছ ইলিশ ও কিছু কথা

প্রতিবেদক
BanglarKotha-বাংলারকথা
ডিসেম্বর ২৬, ২০২২ ১২:১২ অপরাহ্ণ

লেখক: মো : হায়দার আলী:
প্রখ্যাত লেখক হুমায়ূন আহমেদ পদ্মার ইলিশ চেনার একটি মোক্ষম উপায় বােল দিয়েছেন আমাদের। ইলিশ রান্নার একটি বইয়ের ভূমিকা লিখতে গিয়ে সেখানে তিনি লিখেছেন- ইলিশ দ্রুত বেগে ছুটতে গিয়ে পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর উপর নির্মিত হার্ডিঞ্জ ব্রিজের স্প্যানে ধাক্কা খেয়ে ওদের নাক বোঁচা হয়ে যায়। আর নাক ভাঙা সেই ইলিশগুলোই নাকি আসল পদ্মার ইলিশ। ইলিশের প্রতিটি ঝাঁকে কম করে হলেও এক-দুই লাখ মাছ থাকে। অনেক সময় আরো বেশিও থাকতে পারে। এখন তো ইলিশের খরা চলছে।
কবি সতেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯১৫ সালে একটি কবিতা লিখেছিলেন- হালকা হাওয়ায় মেঘের ছাওয়ায়/ইলশে গুঁড়ির নাচ/ইলশে গুঁড়ির নাচন দেখে/নাচছে ইলিশ মাছ। এই ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি নামটা কিন্তু এমনি এমনি হয়নি। অতি সামান্য ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে নদীর পানির সঙ্গে মিশে থাকা ইলিশের একমাত্র খাদ্য ফাইটো প্লাঙ্কটন (সবুজ শ্যাওলা জাতীয় উদ্ভিদ) পানির উপরের স্তরে ভেসে ওঠে। আর সেগুলো খেতে ইলিশের ঝাঁকও উঠে আসে নদীর উপরে। পদ্মার ইলিশের স্বাদ অতুলনীয় হওয়ার মুখ্য কারণটিই হচ্ছে, বর্ষা-মৌসুমে এই সবুজ শ্যাওলা জাতীয় উদ্ভিদ পদ্মা নদীতে পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি।
ইলিশ (বৈজ্ঞানিক নাম:Tenualosa ilisha) বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। এটি একটি সামূদ্রিক মাছ, যা ডিম পাড়ার জন্য বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতের নদীতে আগমন করে। বাঙালিদের কাছে ইলিশ খুব জনপ্রিয়। এ ছাড়াও ইলিশ খাদ্য হিসেবে ভারতের বিভিন্ন এলাকা যেমন, পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, ত্রিপুরা, আসামেও অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মাছ। ২০১৭-এ বাংলাদেশের ইলিশ মাছ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
বাংলা ভাষা, ভারতের আসাম এর ভাষায় ‘ইলিশ’ শব্দটি পাওয়া যায় এবং তেলেগু ভাষায় ইলিশকে পোলাসা (তেলুগু: పులస Pulasa বা Polasa) আখ্যায়িত করা হয়। পাকিস্তানের সিন্ধ ভাষায় বলা হয় (সিন্দু: پلو مڇي Pallu Machhi), ওড়িয়া ভাষায় (ওড়িয়া: ଇଲିଶି Ilishii) গুজরাটে ইলিশ মাছ মোদেন (স্ত্রী) বা পালভা (পুরুষ) নামে পরিচিত। ইলিশ অর্থনৈতিক ভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ গ্রীষ্মমন্ডলীয় মাছ। বঙ্গোপসাগরের ব-দ্বীপাঞ্চল, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নদীর মোহনার হাওরে থেকে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে ইলিশ মাছ ধরা হয়। এটি সামুদ্রিক মাছ কিন্তু এই মাছ বড় নদীতে ডিম দেয়। ডিম ফুটে গেলে ও বাচ্চা বড় হলে (যাকে বাংলায় বলে জাটকা) ইলিশ মাছ সাগরে ফিরে যায়। সাগরে ফিরে যাবার পথে জেলেরা এই মাছ ধরে। এই মাছের অনেক ছোট ছোট কাটা রয়েছে তাই খুব সাবধানে খেতে হয়।
আর পদ্মায় সাধারণত তিন রকম ইলিশ পাওয়া যায়। পদ্ম ইলিশ, চন্দনা ইলিশ আর গুর্তা ইলিশ। পদ্ম ইলিশের দেহ চকচকে রুপোলি এবং পিঠের দিকে সবুজ আভা। পদ্ম ইলিশের মধ্যে মেয়েরা পুরুষের চেয়ে আকারে একটু বড়। চন্দনা ইলিশের দেহে রুপোলি হলেও পিঠে কালো, হলুদ ও কমলা রঙের ছটা থাকে। এদের প্রকৃত আবাস সমুদ্রে, তবে নদী মোহনায় এদের কখনো কখনো পাওয়া যায়। কারণ বর্ষাকালে এরা মাঝে মাঝে নদীতে বেড়াতে আসে। আকারে এরা পদ্ম ইলিশের চেয়েও ছোট। ‘গুর্তা ইলিশ’ মূলত এরা উপকূলীয় সাগর এবং সাগর মোহনায় বাস করে।
নদীর মোহনা থেকে সাত-আট কিলোমিটারের মধ্যেই এদের চলাফেরা করতে দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের কাছে চন্দনা ও গুর্তা ইলিশের জীবনযাত্রা এখনো রহস্যজনক।
 আর বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিন নদী থেকে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়লেও একদল সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতিনিয়তই ইলিশের দাম ওঠা-নামা করে। আর এই সিন্ডিকেট চক্রের জন্যই নাকি ইলিশের প্রকৃত মূল্য পায় না গরিব মৎস্যজীবীরা। লাভবান হন সিন্ডিকেটের হোতারা।
এ প্রসঙ্গে একটি গল্প মনে পড়ে গেল, ১২৭২ খিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে রাজা প্রথম অ্যাডওয়ার্ডের রাজত্বকালে একটি রাজকীয় সনদের মাধ্যমে লন্ডন শহরে প্রথম মৎস্য ব্যবসায়ীদের সমিতি করার অনুমতি প্রদান করা হয়। অ্যাডওয়ার্ডের উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। তিনি আইন করে দিয়েছিলেন যে মৎস্য ব্যবসায়ীরা এক শিলিং-এ এক পেনির বেশি মুনাফা করতে পারবে না। সেই সঙ্গে বিদেশি কোনো ব্যবসায়ীকেও অংশীদার হিসেবে নিতে পারবে না মৎস্য ব্যবসায়ীরা। কিন্তু মৎস্যজীবী সমিতি আসলে সমিতির অন্তরালে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাছের ব্যবসায় একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার শুরু করে দেয়। এক সময় এই সিন্ডিকেট সদস্যরা এতটা বিত্তশালী ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে তাদের কেউ কেউ প্রচুর অর্থ খরচ করে বিভিন্ন শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়ে যায় এবং আরও বেশি করে ক্ষমতা খাটাতে থাকে।  আর এ কারণে দ্বিতীয় অ্যাডওয়ার্ড ক্ষমতায় এসেই পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন করেন যে, মাছ ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত কেউই আর মেয়র হতে পারবে না।
 ইংল্যান্ডে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ছিল সেই আট-ন’শ বছর আগে। অথচ আমাদের দেশে তথ্যপ্রযুক্তির এই একবিংশ শতকেও সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের জন্য বঞ্চিত হচ্ছে, মেহনতি গরিব মৎস্যজীবীরা।  পাঠকদের জন্য একটি বিস্ময়কর তথ্য তুলে ধরা হলো।
 বিগত বেশ কিছু বছর ধরে ইলিশ মাছের উপর গবেষণা করছেন দিগেন বর্মন নামে এক মৎস্য অনুরাগী। তিনি বঙ্গোপসাগর ও দিঘাতে বেশ কয়েক বছর ধরে ইলিশ মাছ ধরছেন, এমন কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা বলে অবাক হয়েছেন, যখন তারা তাকে বলেছে- “এবার আমরা সমুদ্রে অনেক ছোট ছোট ইলিশ মাছ ধরেছি। যা আমরা বিগত ২০ বছরের মধ্যে কখনো দেখিনি। কিন্তু সিন্ডিকেট এর কারনে দাম কমছে না কোন ভাবে।
যদিও ইলিশ লবণাক্ত পানির মাছ বা সামুদ্রিক মাছ, বেশিরভাগ সময় সে সাগরে থাকে কিন্তু বংশবিস্তারের জন্য প্রায় ১২০০ কিমি দূরত্ব অতিক্রম করে ভারতীয় উপমহাদেশে নদীতে পারি জমায়। বাংলাদেশে নদীর সাধারণ দূরত্ব ৫০ কিমি থেকে ১০০ কিমি। ইলিশ প্রধানত বাংলাদেশের পদ্মা (গঙ্গার কিছু অংশ), মেঘনা (ব্রহ্মপুত্রের কিছু অংশ) এবং গোদাবরী নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এর মাঝে পদ্মার ইলিশের স্বাদ সবচেয়ে ভালো বলে ধরা হয়। ভারতের রূপনারায়ণ নদী, গঙ্গা, গোদাবরী নদীর ইলিশ তাদের সুস্বাদু ডিমের জন্য বিখ্যাত। ইলিশ মাছ সাগর থেকেও ধরা হয় কিন্তু সাগরের ইলিশ নদীর মাছের মত সুস্বাদু হয় না। দক্ষিণ পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশেও এই মাছ পাওয়া যায়। সেখানে মাছটি পাল্লা নামে পরিচিত। এই মাছ খুব অল্প পরিমাণে থাট্টা জেলায় ও পাওয়া যায়। বর্তমানে সিন্ধু নদীর জলস্তর নেমে যাওয়ার কারণে পাল্লা বা ইলিশ আর দেখা যায় না।
কথায় বলে  মাছের রাজা ইলিশ টিভি বিজ্ঞাপনে নব্বই দশকের সাড়া জাগানো একটি স্লোগান পর আজও মানুষের মুখে মুখে। ইলিশ পছন্দ করে না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। পদ্মার ইলিশের কথা ভাবতেই অনেকের জিভে পানি এসে যায়। ইলিশ দিয়ে নানা রকম মুখরোচক রান্না হয়।
যেমন সরষে ইলিশ, ইলিশ পোলাও, ইলিশ দোপেঁয়াজো, ইলিশ পাতুরি, ইলিশ ভাজা, কলা পাতায় ইলিশ, স্মোকড ইলিশ, ইলিশের মালাইকারি, ইলিশের টক ইত্যাদি। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের ইলিশ মাছ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
একটি ইলিশের সর্বাধিক দৈর্ঘ্য ৬০ সেমি.। বড় আকারের ইলিশের ওজন হয় প্রায় ২.৫ কিলোগ্রাম। স্ত্রী মাছ দ্রুত বাড়ে এবং সচরাচর পুরুষ ইলিশের চেয়ে আকারে বড় হয়। এ মাছ এক থেকে দুই বছরে প্রাপ্তবয়স্ক হয়। ইলিশ সারা বছর সাগরে থাকে। শুধু ডিম পাড়ার সময় নদীতে আসে। নদীর ইলিশ বেশি উজ্জ্বল, কিছুটা রূপালী হয়। সাগরের ইলিশ লম্বা, সরু হয়। সাগরের ইলিশ তুলনামূলক কম উজ্জ্বল হয়।
মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের ইলিশ বিষয়কপ্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমান বলেন, সাগর থেকে ইলিশ যখন ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে আসে, মানে উজানে আসে তখন নদীর যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী খায়। ইলিশ মাছ তার কারণে তার শরীর বেটে ও মোটা হয়। নদীর ইলিশ তুলনামূলক স্বাদ ভালো হয়। কারণ, সমুদ্র থেকে ইলিশ নদীতে ঢোকার পরে নদীর উজানে মানে স্রোতের বিপরীতে যখন চলে, সে সময় এদের শরীরে ফ্যাট বা চর্বি জমা হয়। এই ফ্যাট বা তেলের জন্যই ইলিশের স্বাদ হয়। বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৮৬ শতাংশই বাংলাদেশে আহরণ করা হয়।
আর বাংলাদেশের মোট ইলিশ উৎপাদনের ৬০ ভাগ আসে বরিশাল অঞ্চল থেকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯০ হাজার টন। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। সূত্র জানায়, ২০১৯-২০২০ সমাপ্ত অর্থবছরে সেই রেকর্ড ভেঙে এখন পর্যন্ত ইলিশের উৎপাদন ৫ লাখ ৩৩ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ গত ১১ বছরের ব্যবধানে দেশে ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৮৪ শতাংশ।
তথ্যানুযায়ী, ১০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। বর্তমানে ১২৫ থেকে ১৩০টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। দেশে প্রায় ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে ইলিশের অভয়াশ্রম।
ইলিশ উৎপাদনের অব্যাহত প্রবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশকে ইলিশ উৎপাদনের রোল মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ রয়েছে প্রথম স্থানে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও সাধারণ মানুষের সচেতনতার কারণে বাংলাদেশে গত তিন বছরে দেশের ইলিশের উৎপাদন আকৃতি ও ওজন বেড়েছে। বাংলাদেশে উৎপাদন বাড়লেও অন্য দেশগুলোতে কমেছে। উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি ইলিশের গড় দাম গত এক বছরে ২০ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারসহ নানা দেশে ইলিশ উৎপাদন হয়। ইলিশের জীবনচক্র বেশ বৈচিত্র্যময়। খাদ্য বিষয়ক লেখক শওকত ওসমান জানান, ইলিশ সমুদ্র থেকে এসে নদীতে ডিম ছাড়ার পর বাচ্চা ইলিশ আবার সমুদ্রে ফিরে যায়। অন্য সব মাছের চেয়ে ইলিশের প্রজনন ক্ষমতা বেশি।
বড় আকারের একটি ইলিশ ২০ লাখ পর্যন্ত ডিম পাড়ে। ইলিশ সারা বছর ডিম পাড়লেও সবচেয়ে কম পাড়ে ফেব্রুয়ারি-মার্চে এবং সবচেয়ে বেশি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। ইলিশ নীল-সবুজ শৈবাল, ডায়াটম, ডেসমিড, কোপিপোড, রটিফার ইত্যাদিও খেয়ে থাকে। তবে এদের খাদ্যাভ্যাস বয়স ও ঋতুর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। পুষ্টিগুণে ইলিশ অনন্য।
১০০ গ্রাম ইলিশে প্রায় ২১ দশমিক ৮ গ্রাম প্রোটিন। ১৮০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ২৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৩.৩৯ গ্রাম শর্করা, ২.২ গ্রাম খনিজ ও ১৯.৪ গ্রাম চর্বি। তাছাড়া আরও রয়েছে উচ্চ পরিমাণ ওমেগা তিন ফ্যাটি এসিড, নায়াসিন, ট্রিপ্টোফ্যান, ভিটামিন, বি ১২, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামসহ অন্যান্য ভিটামিন ও মিনারেলস। আরও আছে জিঙ্ক, ক্রোমিয়াম, আয়রন, সেলেনিয়ামের মতো খনিজও রয়েছে ইলিশ মাছে। জিঙ্ক ডায়াবেটিস রোগীদের পক্ষে খুব ভালো। সেলেনিয়াম অ্যান্টি অক্সিডেন্টের কাজ করে। ইলিশ মাছে রয়েছে ভিটামিন এ, ডি এবং ই।
ইলিশ মাছে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ একেবারেই কম। অন্য দিকে প্রচুর পরিমাণ ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড থাকায় রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। ফলে হার্ট থাকে সুস্থ। ইলিশ মাছে রয়েছে আয়োডিন, সেলেনিয়াম, জিঙ্ক, পটাশিয়াম। এছাড়া ভিটামিন এ ও ডি-র চমৎকার উৎস হল ইলিশ মাছ।
মস্তিষ্কের ৬০ শতাংশই তৈরি ফ্যাট দিয়ে। যার অধিকাংশই ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। যারা নিয়মিত মাছ খান তাদের বয়সকালে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অনেক কম দেখা যায়। শিশুদের মস্তিষ্কের গঠনেও সাহায্য করে ডিএইচএ। ইলিশ মাছ তেলে ভাজলে ফ্যাট ক্যালারির পরিমাণ বেড়ে যায়।
ইলিশে কারও কারও অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। ইলিশ খাওয়ার বেলায় এই বিষয়টি লক্ষ্য রাখতে হবে। এক জরিপে দেখা গেছে, মাওয়া ঘাটের হোটেলগুলোতে শতকরা ৯০ ভাগই ইলিশের নাম করে সার্ডিনসহ অন্য মাছ বিক্রি করা হয়। তাই মাওয়ায় ইলিশ খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ঢাকার কারওয়ানবাজার, যাত্রাবাড়িসহ বেশ কিছু জায়গায় ইলিশের পাইকারি বাজার। এসব জায়গা থেকে কম দামে ভালো ইলিশ কেনা সম্ভব।
মাছে ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটি যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং মাছের আকালে মানুষের পাতে ভাতের সঙ্গে মাছ রাখা কঠিন হয়ে গেছে। জাতীয় মাছ ইলিশ যে ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে কিনে খাবেন সে উপায়ও নেই। সাগরের গহিনে নিরাপত্তার অভাবে ভারত ও মিয়ানমারের দিকে মৎস্যসম্পদ চলে যায়। আবার দেশে যে পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ে তার কিছু অংশ পুঁজার উপহার হিসেবে ভারতে পাঠানো হয়। এতে করে দেশের সাধারণ মানুষের ভাতের প্লেটে ইলিশ দূরহ হয়ে পড়ে। কিন্তু মৎস্যবিজ্ঞানীদের সুপারিশ অনুযায়ী ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে সরকারের ‘প্রজননের সময় ইলিশ ধরা’ নিষিদ্ধ উদ্যোগে সফলতা এসেছে। ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করায় এবার ডিম ছেড়েছে ৮৪ শতাংশ মা ইলিশ। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চলতি বছর সর্বোচ্চ সংখ্যক মা ইলিশ নদীতে ডিম ছেড়েছে। বলা যায় ইলিশ উৎপাদনে এবার বিপ্লব ঘটতে যাচ্ছে।
জানা যায়, নির্বিঘ্ন প্রজনন নিশ্চিত করায় উপকূলের ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকাসহ অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে প্রায় ৮৪ শতাংশ মা ইলিশ ডিম ছেড়েছে। এরমধ্যে ৫২ ভাগ মা ইলিশ ২২ দিনের মূল প্রজননকালীন সময়ে সম্পূর্ণ ডিম ছাড়ে। পরবর্তী ৭ দিনে বাকি ৩২ শতাংশ ডিম ছেড়েছে। বিভিন্ন নদ-নদীতে তিনটি ধাপে চালানো গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে এ ফলাফল পেয়েছে চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট।
 এদিকে জেলে ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, আগামী জাটকা রক্ষার অভয়াশ্রম কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন করা গেলে এবার ইলিশ উৎপাদনে এক বিপ্লব ঘটবে। গবেষকেরা বলছেন, ইলিশে আবার সুদিন ফিরছে। মৎস্যবিজ্ঞানীদের দেওয়া সুপারিশ অনুযায়ী ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করায় এবার কমপক্ষে ৫ থেকে ৭ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন সম্ভব হবে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) এক গবেষণায় বলা হয়, বলেশ্বর নদ দেশের ইলিশের বড় উৎস। সেখান থেকে বছরে আরও ৫০ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত ইলিশ আহরণ করা সম্ভব। বলেশ্বর নদের মোহনায় বিষখালী, পায়রা, আন্ধারমানিক ও লতাচাপলী নদ-নদী এসে মিশেছে। ওই পথ দিয়ে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ বঙ্গোপসাগর থেকে নদের উজানে প্রবেশ করে। বলেশ্বর নদের সঙ্গে পূর্ব সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খাল যেমন ভোলা নদী, বেতমোরী গাঙ, সুপতি খাল, দুধমুখী খাল ও ছোট কটকা খাল এসব সংযুক্ত। বলেশ্বর নদ হয়ে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ এসব খাল ও নদ-নদীতে প্রবেশ করে।
মৎস্য অধিদফতরের দেয়া তথ্যমতে, দেশে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল ৩.৮৮ লাখ মেট্রিক টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩.৯৫ লাখ মেট্রিক টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪.৯৭ লাখ মেট্রিক টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫.১৭ লাখ মেট্রিক টন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫.৩৩ লাখ মেট্রিক টন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ৫.৫ লাখ মেট্রিক টন এবং গেল ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৫.৬৫ লাখ মেট্রিক টন।
অনেক বাঙালি হিন্দু পরিবার বিভিন্ন পূজার শুভ দিনে জোড়া ইলিশ বা দুই টি ইলিশ মাছ কেনে। সরস্বতী পূজা ও লক্ষ্মী পূজায় জোড়া ইলিশ কেনা খুব শুভ লক্ষন হিসেবে মনে করা হয়। কিন্তু এই প্রথা পূর্ব বাংলার (আজকের বাংলাদেশের) বাঙ্গালী হিন্দুদের মাঝে প্রচলন ছিল এখন যাদের অনেকেই ভারত বিভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে, আসাম ও ত্রিপুরায় বাস করে। তাদের অনেকে লক্ষ্মী দেবীকে ইলিশ মাছ উৎসর্গ করে। অনেকেই ইলিশ উৎসর্গ ছাড়া পূজাকে অসম্পূর্ণ মনে করে।
লেখক: মো. হায়দার আলী
 সিনিয়র সাংবাদিক,  কলামিষ্ট,
প্রধান শিক্ষক, মহিশালবাড়ী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়
সসভাপতি
জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা, গোদাগাড়ী উপজেলা শাখা, রাজশাহী।

সর্বশেষ - প্রচ্ছদ