এন্ড্রু কিশোর ভালোবাসার অপার বিস্ময়

ইকবাল হোসেন
গান মনকে সুন্দর করে, মন ভাল করে। গান ভালোবাসতে শেখায়। গান মনে শক্তি আনে, প্রতিবাদ করতে শেখায়। গান মানবতা শেখায়, অন্যায় ও সকল প্রকার বৈষম্য দুর করতে সাহায্য করে। গান বিনোদনের অন্যতম বাহক। গান মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখায়।

ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধে গান অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছিল বলেই আমরা জানি। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় অধিকার আদায়ে গান আমাদের অনুপ্রেরণা দিয়েছে সবসময়। কাজেই গান আমাদের অধিকার আদায় করতেও শেখায়, উৎসাহিত করেছে সবসময়।

১৯৯০ সালের দিকে তখন বোধহয় পঞ্চম/ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। বাসায় একটা রেডিও ছিল। রেডিওতে অনেক প্রোগ্রাম হত। তবে আকর্ষণের বিষয় থাকত বাংলা সিনেমার গান। আরও মনে আছে পনের মিনিটের এক একটা গানের অনুষ্ঠান হত। তিনটি করে গান হত। অনুষ্ঠান শেষে শ্রোতাদের জন্য একটা করে ধাঁধা থাকত- গানের শিল্পী কে বা কারা অথবা গানটি কোন সিনেমা থেকে নেয়া হয়েছে? কখনও গানটির গীতিকার কে, এমন প্রশ্নও থাকত। তবে সংখ্যায় কম। প্রশ্নের উত্তর পাঠানোর জন্য পোস্টকার্ড অথবা ডাকযোগে প্রেরণ করতে হত। পরের সপ্তাহে ঐদিন ঠিক ঐ সময়ে সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম উত্তর ঠিক হল কিনা, জানার জন্য। আর নাম ঘোষণা করলে তো মহাখুশি হতাম। একের অধিক নাম দিয়েও উত্তর দেয়া যেত। এটা যেন বিরাট একটা বিষয় ছিল আমাদের কাছে।

পুরুষ শিল্পীর নাম বলাটা অনেকটা সহজ হত। কারণ সিংহভাগ গানেই কণ্ঠ দিয়েছেন প্লেব্যাক সম্রাট এন্ড্রু কিশোর- ভালবাসার অপার বিস্ময়। গানের প্রতি প্রেমে পড়া, গানকে ভালোবাসা, গান গাওয়ার চেষ্টা থেকে সবকিছুতেই অনুপ্রেরণায় ছিলেন তিনি। আমার শোনা ও দেখা এখনকার অনেক শিল্পীর আদর্শের কেন্দ্রবিন্দুতে কিশোর দা। তাকে দেখে ও ভালোবেসে উৎসাহিত হয়ে গানে হাতেখড়ি হয়েছে অনেকের। তার অনুপ্রেরণায় বহুজন শিল্পী হয়েছেন।

বছর দুতিন পরের ঘটনা- গোটাপাড়ায় দুটা টেলিভিশন, একটা ১৪” অন্যটা ১৭” সাদা-কালো। এসএসসি পর্যন্ত বরাবরই বাড়ি থেকে সন্ধ্যার পর বের হওয়া নিষেধ ছিল। ব্যাটারি দিয়ে চলত টিভি। বড় বাঁশের মাথায় এন্টেনা টাঙানো। কখনও ছবি ভাল দেখা না গেলে শুরু হত বাঁশ ঘোরানো। শুক্রবার বিকেলে সিনেমা দেখা। যাদের বাসায় টিভি- দুপুর থেকে সেখানে ভিড় শুরু হত- যেন উৎসব চলছে। কেউ বা বড় পাটি নিয়ে আসত, কেউবা টুলে বসত, কেউ বসত চেয়ারে- ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভর করে আমাদের অবস্থান বরাবরই পাটিতে। তখন সিনেমা মানেই গানের সমাহার। ছায়াছবির গানের অনুষ্ঠান ‘ছায়াছন্দ’ দেখার সে কি ধুম! আর গান মানেই এন্ড্রু কিশোর, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, সৈয়দ আব্দুল হাদী, প্রমুখ শিল্পীবৃন্দ।

মজার বিষয় নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ‘নয়নের আলো’ সিনেমার গান ‘আমার সারা দেহ খেওগো মাটি, আমার বুকের মধ্যেখানে মন যেখানে হৃদয় সেখানে, আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান’- গানগুলো শুনে ভীষণ ভালো লেগেছিল। মুখে মুখে ছিল সে গানগুলো।

একদিন গান গাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। আমার গান শুনে আমাকে বলেছিল খুব এন্ড্রু কিশোর হওয়ার ইচ্ছা দেখছি। আমি হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলাম, সে তো গড গিফটেড। শতইচ্ছা সত্বেও, শত সাধনা করেও তার মত সুরেলা কণ্ঠ পাওয়া যায় না। সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসার দান সে। মেয়েটা বলেছিল, এন্ড্রু কিশোরকে সে ভীষণ ভালবাসে। তার গান সে পাগলের মত শোনে ও পছন্দ করে। দুদিন পর সে আমাকে একটা চিরকুট দিয়েছিল। তাতে লেখা ছিল’ গাছটি সবুজ ফুলটি লাল, তোমার আমার ভালোবাসা থাকবে চিরকাল’। এর মাধ্যমে মেয়েটা যে আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিল সেটা একবছর পরে আমি বুঝেছিলাম। আসলে তার গাওয়া আধুনিক গানের আবেদনগুলো ছিল ভীষণ ভালোবাসাময় ও প্রেমময় যা সবসময়ই আমাদের আবেগাপ্লুত করেছে ও মনকে আন্দোলিত করেছে।

যা হোক তাঁর গাওয়া গান ‘ভেঙেছে পিঞ্জর, মেলেছে ডানা’, পড়ে না চোখের পলক, চোখের জলে আমি ভেসে চলেছি, হায়রে মানুষ রঙিন মানুষ, কারে দেখাবো মনের দুঃখ গো, আমি চিরকাল প্রেমেরও কাঙাল, ওগো বিদেশিনী তোমার চেরি ফুল দাও, তুমি মোর জীবনের ভাবনা, জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প, চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা, কত রঙ জানো রে মানুষ, ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে- প্রভৃতি গান যেন বারবার ফিরে আসে ভাললাগা আর ভালোবাসায়। ভালোবাসার এক অপার বিস্ময় এন্ড্রু কিশোরের গান।

এন্ড্রু কিশোর ও কতিপয় শিল্পীর কণ্ঠে বাংলা গানে স্বর্ণযুগ এসেছিল, যা এখনো বহমান। সে সময়ের গানগুলো এখনও চিরসবুজ, চিরযৌবনা। এখনো শুনলে মন নেচে ওঠে অপরিসীম আনন্দে, এক অসম্ভব ভাললাগা তৈরি হয়। সে গানগুলোর গীতিকার ও সুরকারবৃন্দের প্রতিও রইল অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। বলা যায়, গানের স্বর্ণযুগের কারণে সে সময়ের বাংলা সিনেমাগুলোও বেশ কালজয়ী দর্শকনন্দিত হয়েছে।

বারবার ফিরে আসুক প্লেব্যাক সুর সম্রাট এন্ড্রু কিশোর- গানে, সুরে, ভালোলাগা আর ভালোবাসায়। পদ্মা তীরবর্তী রাজশাহীর মানুষ সবসময় কৃতজ্ঞ থাকবে তাঁর প্রতি। তাঁর গানকে পাগলের মত ভালোবাসবে। তিনি বেঁচে থাকবেন তার কাজে ও কর্মে। কণ্ঠ শ্রমিক এ মহান শিল্পীর এভাবে অকালে চলে যাওয়া সত্যিই আমাদের জন্য অনেক কষ্টের।

এন্ড্রু কিশোর বেঁচে থাকলে সুর ও গানের জগৎটা হয়ত আরও অনেক বেশি সমৃদ্ধ হত, সমৃদ্ধ হত সমাজ ও রাষ্ট্র। আমাদের দুর্ভাগ্য প্রকৃতির নিয়মে তাঁর অকালে প্রয়াণ মেনে নিয়েই আমাদের পথ চলতে হবে। পরিশেষে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা এ কণ্ঠ শ্রমিককে তিনি যেন ওপারে ভাল রাখেন।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, রাজশাহী সরকারি পিএন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়

বাংলার কথা/জুলাই ১৭, ২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
%d bloggers like this: