রবিবার , ২০ নভেম্বর ২০২২ | ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯
  1. অর্থনীতি
  2. আন্তর্জাতিক
  3. খুলনা বিভাগ
  4. খেলাধুলা
  5. চট্টগ্রাম বিভাগ
  6. জাতীয়
  7. ঢাকা বিভাগ
  8. প্রচ্ছদ
  9. ফিচার
  10. বরিশাল বিভাগ
  11. বিনোদন
  12. মতামত
  13. ময়মনসিংহ বিভাগ
  14. রংপুর বিভাগ
  15. রাজনীতি

এক বছরে বুড়িগঙ্গা থেকে উদ্ধার ৪১ লাশ

প্রতিবেদক
BanglarKotha-বাংলারকথা
নভেম্বর ২০, ২০২২ ২:০৪ অপরাহ্ণ

নিউজ ডেস্ক :
নারায়ণগঞ্জের লাইফলাইন খ্যাত ঐতিহ্যবাহী শীতলক্ষ্যাকে বিশ্ববাসীর কাছে ‘অপয়া’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-কালচার আর শিল্পকারখানা সব কিছুই শীতলক্ষ্যার বদৌলতে। এককালে শীতলক্ষ্যা থাকত উত্তাল ঢেউ। এখন নীরব-নিস্তব্ধ। এক সময় স্থানীয়রা শীতলক্ষ্যার পানি ‘দাওয়াই’ হিসেবে ব্যবহার করতো। সেই পানি এখন লাল রক্তে দূষিত হয়ে পড়েছে।

ইতিহাস-ঐতিহ্যের শীতলক্ষ্যা-বুড়িগঙ্গা আজ লাশের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। নীরব শীতলক্ষ্যা-বুড়িগঙ্গা লাশের ভাগাড়ে ফুলে-ফেঁপে উঠছে। অহরহই মিলছে শীতলক্ষ্যায় লাশ। এসব লাশের দু’একটির পরিচয় মিললেও অধিকাংশের কোনো পরিচয় মেলেনি। একের পর এক লাশ উদ্ধারের খবরে শঙ্কিত মানুষ। শঙ্কিত পুলিশ-প্রশাসনও। জনমনে দেখা দিয়েছে নানা আতঙ্ক-নানা প্রশ্ন। শুধু বুড়িগঙ্গা থেকেই উদ্ধার হয়েছে ৪১ লাশ। সে হিসাবে প্রতি ৯ দিনে নদীটিতে একটি করে লাশ ফেলা হয়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্য কোনো স্থানে খুন করে লাশ এনে ফেলা হচ্ছে এসব নদীর নির্জন স্থানে। রাজধানী লাগোয়া বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদী থেকে প্রায়ই উদ্ধার হচ্ছে লাশ। এ দুই নদীর বেশ কিছু নির্জন স্থানকে অপরাধীরা লাশ ফেলার ‘নিরাপদ এলাকা’ হিসেবে ব্যবহার করছে।

পচে-গলে যাওয়ায় অনেক মরদেহ থেকে ফিঙ্গার প্রিন্ট নেওয়া যায় না। বাহ্যিক অবয়ব দেখেও পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই বেওয়ারিশ হিসেবে কিছু কিছু মরদেহ দাফন করা হচ্ছে। এতে মৃত্যুরহস্য থেকে যাচ্ছে অজানা। হত্যা, দুর্ঘটনা নাকি আত্মহত্যা তাও পরিষ্কার করা যাচ্ছে না। রহস্য উন্মোচন না হওয়ায় অপরাধীরা কিছু ঘটনায় থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সম্প্রতি ঢাকার অদূরে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে মাথা ও বুকে আঘাত করে হত্যা করা হয়। তার খুনের রহস্য এখনো উন্মোচন করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। এর কয়েকদিন পর বুড়িগঙ্গার ফতুল্লা থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দুরন্ত বিল্পবের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

এর আগে ১৭ জানুয়ারি অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয় একই নদী থেকে। নৌপুলিশ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে ৪১ জন নারী, পুরুষ ও শিশুর বিকৃত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বুড়িগঙ্গা নদী থেকে। সে হিসাবে গড়ে প্রতি ৯ দিন অন্তর একটি করে লাশ পড়েছে এ নদীতে। এছাড়া তুরাগ থেকে প্রায় ১৪টি, শীতলক্ষ্যা থেকে ২০টি এবং বাকি নদীগুলো থেকে আরও ২৫টির বেশি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর অধিকাংশই হত্যাকাণ্ডের শিকার। তবে এসব লাশের বেশির ভাগেরই পরিচয় না পাওয়া এবং তাৎক্ষণিকভাবে হত্যা না দুর্ঘটনা, তা নিশ্চিত হতে না পারায় বিপাকে পড়েছে তদন্তকারী সংস্থা। কিছু লাশের ক্ষেত্রে শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখে পুলিশই হত্যা মামলা করেছে। হত্যার আলামত পাওয়া যায় না যেসব লাশের, সেগুলোর ক্ষেত্রে অপমৃত্যু মামলা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে বেশির ভাগ পরিচয়হীন লাশের ঠিকানা হয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামে।

এসব হত্যা বা অপমৃত্যু মামলার মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি মামলার রহস্য পুলিশ উদ্ঘাটন করতে পারলেও বহু মামলা বছরের পর বছর তদন্তের বেড়াজালে আটকে আছে। নৌ পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত ২২ মাসে বিভিন্ন নদী থেকে ৬৭৫ জনের লাশ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে হত্যার শিকার ৭৭ জন। মোট লাশের মধ্যে ১৮০ জন শনাক্ত হয়নি। এর মধ্যেও খুনের ঘটনা থাকতে পারে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালে নৌ পুলিশের আওতাধীন বিভিন্ন নদীতে লাশ উদ্ধারের সংখ্যা ৩৫৭ জন। এর মধ্যে ১২৩ জনের মৃত্যুর বিষয়ে অপমৃত্যু মামলা হয়েছে সংশ্নিষ্ট থানাগুলোতে। হত্যা মামলা হয়েছে ৩৬টি। ১৯৮ জনের লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ৮৮ জনের লাশের পরিচয় পাওয়া যায়নি। ফলে এসব লাশ অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করা হয়েছে। এই ৮৮ জন খুনের শিকার নাকি দুর্ঘটনার তা অন্ধকারেই রয়ে গেছে। গত জানুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত লাশ উদ্ধার হয়েছে ৩১৮টি।

এর মধ্যে হত্যার শিকার ৪১ জন। ৯২ জনের লাশের পরিচয় না মেলায় অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করা হয়েছে। এদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা অজানাই থেকে গেছে। অঞ্চলভেদে নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলে ২০২১ সালে লাশ উদ্ধারের সংখ্যা ৩৮টি। এর আগের বছর ছিল ৩২টি। সে হিসাবে গত বছর লাশ উদ্ধারের সংখ্যা বেড়েছে ছয়টি। গত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৩৫ জনের মৃতদেহ। হাসনাবাদ, সদরঘাট, বরিসুর, বছিলা, আমিনবাজার, আশুলিয়া ও টঙ্গী পর্যন্ত নদীপথ এবং ডেমরা ও রাজাখালী ছাড়াও নরসিংদীর কিছু এলাকা ঢাকা অঞ্চলের আওতাধীন। সূত্র বলছে, বুড়িগঙ্গা নদী লাশের ‘ডাম্পিং জোন’ হিসাবে প্রথম আলোচনায় আসে ২০০২ সালে। ওই বছরের ১০ নভেম্বর বুড়িগঙ্গা নদীর চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতুর নিচে এক পিলারের ওপর থেকে মডেল সৈয়দা তানিয়া মাহবুব তিন্নির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই লাশের পরিচয়ও প্রথমে কারও জানা ছিল না। একপর্যায়ে পরিবারের লোকজন থানায় এসে লাশটি তিন্নির বলে শনাক্ত করে।

গত বছরের ৩১ জুলাই পুলিশ বুড়িগঙ্গা থেকে উদ্ধার করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র আরিফুল ইসলামের লাশ। এটিও প্রথমে অজ্ঞাতপরিচয় হিসাবে উদ্ধার করা হয়েছিল। একই বছরের ৫ আগস্ট বুড়িগঙ্গার পোস্তগোলা থেকে ব্যবসায়ী শাহনেওয়াজ মিয়ার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার বোনজামাই সোহেল আহমেদ জানান, শাহনেওয়াজ লালবাগ এলাকায় ব্যবসা করতেন। সন্ত্রাসীরা তাকে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেয়। এছাড়া গত বছরের ১৩ নভেম্বর বুড়িগঙ্গা থেকে ব্যবসায়ী নূরুল আমীন মন্টুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার ছেলে আমির হোসেন বলেন, পূর্বশত্রুতার জেরে সন্ত্রাসীরা তার বাবাকে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি ঢাকার ফরিদাবাদ আর্সিনগেট বরাবর বুড়িগঙ্গা নদী থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক তরুণীর (২০) লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

তার জিভ কামড়ে ধরা ছিল। ধারণা করা হয়, তাকে শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানী ঢাকার অতি সন্নিকটে রুপগঞ্জ। ঢাকা থেকে শীতলক্ষ্যা নদে আসতে সময় লাগে আধা-ঘন্টা। আর রাজধানী ঢাকা থেকে শতিলক্ষ্যা আসতে কয়েকটি পয়েন্ট রয়েছে। এর মধ্যে কুড়িল-কাঞ্চন ৩০০ ফুট সড়ক, ত্রিমহনী-কায়েতপাড়া সড়ক ও যাত্রাবাড়ী-সুলতানা কামাল সেতু সড়ক। এ ছাড়া ইঞ্জিনচালিত নৌ-পথ হচ্ছে বেড়াইদ-ইছাখালী খাল ও বালু নদের মোহনা। ঢাকার উপকন্ঠে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে খুনিরা লাশ শীতলক্ষ্যায় ফেলে রেখে যায়। অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, শীতলক্ষ্যা নদে লাশ ফেলার আরেকটি বিশেষ কারণ, এ নদে লাশ ফেললে জোয়ার কিংবা ভাটার টানে লাশটি যথাস্থানে থাকে না। শীতলক্ষ্যা নদ মেঘনার মোহনায় গিয়ে মিলিত হওয়ার কারণে লাশ স্রোতের টানে অনেক সময় মেঘনায় চলে যায়। ফলে লাশের অংক মেলাতে কষ্ট হয়। যদিও ঢাকার পাশে বালু নদ। ওই নদের স্রোত প্রবাহ না থাকায় শীতলক্ষ্যা নদকেই বেছে নেওয়া হয়।

এ ছাড়া রুপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় হত্যাকাণ্ডের পর চতুর হত্যাকারীরা লাশ শীতলক্ষ্যা নদে ফেলে রেখে যায়। যেন লাশের নাম-পরিচয় কিংবা হদিস না মেলে। মূলত এসব কারণেই চতুর খুনিরা শীতলক্ষ্যাকে লাশ ফেলার নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে। শীতলক্ষ্যার আশপাশে বসবাসকারী এলাকাবাসীরা বলেন, পুলিশ যদি সক্রিয় হয় তাহলে হয় তো অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব। লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ আর এসব নিয়ে তেমন তৎপর থাকে না। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. জাফর ইকবাল বলেন, নদীতীরের অপরাধের স্থানগুলো চিহ্নিত করে ওইসব জায়গায় নজরদারি বাড়াতে হবে। এছাড়া কমিউনিটি পুলিশিংয়ের টহল জোরদার এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। ঢাকা জেলা নৌপুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, ঢাকার চারপাশের নদীপথ অনেক বিস্তৃত। নৌপুলিশ একটি নতুন ইউনিট। এখানে লোকবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট অনেক কম। এরপরও কিছু এরিয়া নির্বাচন করে সেখানে টহল ও নজরদারি জোরদার করেছি।

সর্বশেষ - প্রচ্ছদ