বুধবার , ১৯ অক্টোবর ২০২২ | ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯
  1. অর্থনীতি
  2. আন্তর্জাতিক
  3. খুলনা বিভাগ
  4. খেলাধুলা
  5. চট্টগ্রাম বিভাগ
  6. জাতীয়
  7. ঢাকা বিভাগ
  8. প্রচ্ছদ
  9. ফিচার
  10. বরিশাল বিভাগ
  11. বিনোদন
  12. মতামত
  13. ময়মনসিংহ বিভাগ
  14. রংপুর বিভাগ
  15. রাজনীতি

আপাদমস্তক কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী মানুষ ছিলেন সাংবাদিক আফতাব ভাই

প্রতিবেদক
BanglarKotha-বাংলারকথা
অক্টোবর ১৯, ২০২২ ৩:৪১ অপরাহ্ণ

লেখক, সরকার মাজহারুল মান্নান :
সাংবাদিক আফতাব ভাইয়ের সাথে দীর্ঘ ১৫ পনের বছরের পথ চলায় বিরতি হলো আজ (১৮ অক্টোবর ২০২২ সকাল ৬ টা ২০ মিনিট) থেকে। যিনি আমার ক্ষুদ্র সাংবাদিকতার অন্যতম অভিভাবক। যিনি একজন আপাদমস্তক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মানুষ। তিনি এতবেশি কৃতজ্ঞ মানুষ ছিলেন যে আমার মতো একজন নস্যি সাধারণ সংবাদ শ্রমিককেও প্রকাশ্যে যেখানে সেখানে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে লজ্জায় ফেলিয়ে দিতেন। না পেতাম সেটা নিতে না পেতাম সেটা ফিরিয়ে দিতে। তার বিনয়ের কাছে সব কিছু হার মানতো আমার।
এক সময় আফতাব ভাই, মরহুম আলী আশরাফ মামাসহ অনেকেই আমার বাসা থেকে টেলিভিশনে ফুটেজ পাঠাতেন। শীতের সময় সাত সকালে উঠতে হতো আমাকে। স্বাভাবিকভাবেই একটুখানি দেরিতে উঠতেন আশরাফ মামা ও আফতাব ভাই। ওনাদের ৭ টার খবরে ফুটেজ ধারাতে হতো। তখন আমি বাসা থেকেই সকালের কাজ সারতাম। প্রায় প্রতিদিনই আশরাফ মামা এবং আফতাব ভাই বাসায় যেতেন। কখনও ওনারা যাওয়ার আগেই ফুটেজ পাঠিয়ে দিতাম ওনাদের অফিসে। এই সামান্য কাজটি আমি আমার দায়িত্ব হিসেবে পালন করতাম। কিন্তু এই সামান্য কাজটি আফতাব ভাই এতোবড় করে ফলাও করতেন প্রত্যেকটি জায়গায়। যা আমার কোনভাবেই পাওয়ার যোগ্যতা ছিল না এখনও নেই হবেও না। যে কোন ঘটনাস্থল, অনুষ্ঠান, কিংবা  আড্ডায় যখনি দেখা হতো তখনই উপস্থিত সবাইকে আফতাব ভাই বলতেন মাজহার আমার সেই ভাই। আমি ঘুমে থাকতাম ফুটেজ চলে যেতো টেলিভিশনে খবর দেখে বাসা থেকে বের হতাম এই ছেলেটার ঋণ আমি কখনই শোধ করতে পারবো না। আফতাব ভাই এমন বিনীতভাবে একথা প্রকাশ্যে জনসম্মুখে বলতেন। যে আমার লজ্জা পাওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকতো না। তাকে থামাতে গেলেই তিনি আরও বেশি করে বলতেন।
একবার বৈশাখি টেলিভিশনের চাকরি নিয়ে তিনি ঝামেলায় পরেছিলেন। ঠিক সেই সময় রংপুর রিপোর্টার্স ক্লাব থেকে সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য (ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায়) মোনাজাত উদ্দিন সাংবাদিকতা পদক প্রদান করা হয়েছিল তাকে। আমার প্রস্তাবনায় সেই সময়ের রিপোর্টার্স ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটি তাকে পদক দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সিদ্ধান্ত হওয়ার পর বিষয়টি আমি তাকে জানিয়ে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলাম ভাই যেহেতু একটা ঝামেলা চলছে, আপনি পদক পাওয়ার বিষয়টি বৈশাখীতে শিরোনামে পাঠান। আমার কথা শুনে খানিকক্ষণ ভেবে তিনি শিরোনামটি পাঠালেন। সাথে সাথে বৈশাখীতে শিরোনামে দেখানো শুরু হলো এভাবে ‘সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য বৈশাখী টেলিভিশনের রংপুর প্রতিনিধি আফতাব হোসেন রিপোর্টার্স ক্লাব মোনাজাত উদ্দিন সাংবাদিকতা পদক লাভ।’ এই শিরোনামটি সারাদিন চলছিল বৈশাখীতে। আল্লাহর রহমতে সেই শিরোনামটি যাওয়ার পর আর বৈশাখীতে আর কেউ তখন যোগাযোগ রাখে নি।
এই বিষয়টিও তিনি জনসম্মুখে প্রকাশ্যে বলতেন। যেখানেই দেখা হতো সেখানেই বলতেন, ‘আমার চাকরি বহালে কাজ করেছে মাজহার। সেই সময় রিপোর্টার্স ক্লাব আমাকে যে মোনাজাত উদ্দীন পদক দিয়েছিল, আমার চাকরিতে বহাল থাকতে সেটা অনেক কাজে লেগেছে।’ এভাবে প্রকাশ্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মানুষ সমাজে কতজন আছে আমার জানা নেই।
আরেক টা বিষয়ে তিনি আমাকে চিরঋণি করে রেখেছেন। দৈনিক প্রথম খবর তখন আতুরঘরে। আমি আর তাজিদুল ইসলাম লাল ভাই রাতদিন পরিশ্রম করে সেই পরিশ্রমের কোন সীমা পরিসীমা ছিল না নতুন আঙ্গিকে কাগজটি মার্কেটে আনি। নিউজ এবং মেকআপে একটি নতুনত্ব দেয়ার চেস্টা করি আমরা। প্রথম খবরের প্রথম এক বছরের যে কোন কাগজ যদি কারো কাছে থাকে সেটা দেখলে হয়তো অনুমান করা যাবে। সেই সময় প্রথম খবরে ‘সাংবাদিকতার বটবৃক্ষ ’ নামে  আফতাব ভাইয়ের জীবন ও কর্ম নিয়ে আমার একটা প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। আফতাব ভাইকে ‘সাংবাদিকতার বটবৃক্ষ’ বলায় সে সময় কেউ কেউ একটু গোস্যাও হয়েছিলেন। আমার এই কাজটিও আফতাব ভাই এমনভাবে মানুষের কাছে উপস্থাপন করতেন যে আমি লজ্জায় পড়ে যেতাম। যেখানেই দেখা সেখানেই ওই লেখার কথা। যার সাথেই তিনি পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তার কাছে তিনি বলেছেন, ও ভার্সিটি থেকে এমএস করা সাংবাদিক, ও আমাকে নিয়ে সাংবাদিকতার বটবৃক্ষ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। অনেকেই এ নিয়ে ওকে নানা কথা শুনিয়েছে।’
আফতাব ভাই এমনভাবে এসব কথা বলতেন। যাদের সামনে বলতেন তারা ছাড়া সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা বোঝানো যাবে না। শুধু তাই নয়, তিনি যে বই লিখেছেন ‘সাংবাদিকতার পথে পথে’। সেই বইয়ের ভূমিকার প্রথমেই তিনি আমার নামসহ ‘সাংবাদিকতার বটবৃক্ষ’ শিরোনামের সেই প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেছেন। একজন অতিশয় ক্ষুদ্র, নস্যি সংবাদকর্মী হিসেবে তার বইয়ের ভূমিকায় আমার নাম উল্লেখ করে আমাকে  যেভাবে কৃতজ্ঞ করেছেন। সেই ঋণ শোধার সামর্থ আমার নেই। কিভাবে মানা যায়, আমার সেই মানুষটাই, সেই অভিভাবকটাই চির বিদায় নিলেন। এটা মানা যায়। তিনি আর কখনই এভাবে আমার কথা কাউকে বলবেন না। এখন আমার মনে হচ্ছে তার এসব কথায় যখন লজ্জিত হতাম। এখন মনে হচ্ছে, সেই লজ্জা পাওয়ার পাশাপাশি নিজেকে কৃতজ্ঞ হওয়ার শিক্ষাটা এখন কার কাছ থেকে পাবো।
রংপুরে মোটামুটি যারা সাংবাদিকতা করেন তারা সবাই একটা বিষয় অবহিত। আফতাব ভাই ছিলেন কাজ পাগল মানুষ। তিনি ঘটনাস্থলেও যেতেন অসুস্থ্য হওয়ার আগ পর্যন্ত। তিনি একটি সংবাদের জন্য অন্তত ৫ থেকে ৭ জনের সাথে কমিউনিকেশন করতেন। দুই/তিন মিনিট পর পর ফোন দিতেন তার মেইলে ফুটেজ গেছে কিনা। নিউজ গেছে কিনা। তার বার বার ফোন করাটা আমিসহ অনেকেই মাঝেমধ্যে অপছন্দ করতাম। কিন্তু তার এই বার বার ফোন করার মধ্যে থাকতো কাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা। সবার আগে অফিসে খবর পাঠানোর তাড়া। সেই শিক্ষাটা আমি আফতাব ভাইয়ের কাছে শিখেছি। আমি যে কাজটা করবো, করার জন্য দায়িত্ব পাবো। সেটা যথাসময়ে-যথাযথভাবে নিশ্চিত করার জন্য আমার মধ্যে তাড়া অনুভব করতে হবে। এখনতো আমরা একবার ফোন দিয়ে না ধরলেই বিগড়ে যাই। আর ফোন দিতে চাই না। ব্যস্ত থাকার কথা বলে ফোনও দেই না।
আফতাব ভাই মোহনা টেলিভিশনের শফিউল করিম শফিক ভাইয়ের অফিসে বসে একসাথে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। আমার এবং শফিক ভাইয়ের মোবাইল নাম্বারটা তার মুখস্ত ছিল। পরে তিনি যখন ক্যামেরা কিনলেন। তখন আলাদাভাবে ভিডিও জার্নালিস্ট নিয়ে বাড়িতে বসে কাজ করতেন। যে কোন ঘটনাস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। সবার আগে নিউজ পাঠানোর চেষ্টা করতেন। মিস করলে আমিসহ অনেককেই ফোন দিতেন।
 তার অনেক কর্মপরিকল্পনা ছিল। তিনি বার বার বলতেন- ছেলের পড়ালেখা শেষ হয়ে চাকরি করা শুরু করলে তিনি একটি দৈনিক কাগজ বের করবেন। অনেকবার উদ্যোগও নিয়েছিলেন। নানা জটিলতায় সেটি হয়নি। বছর পাঁচেক থেকে তিনি লেখালেখি নিয়ে পরে থাকতেন। তিনটি বইও এরইমধ্যে বের হয়েছে। তিনি উত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা কার্যক্রম করছিলেন। কোথাও বক্তব্য দিলে তিনি বিষয়ের ওপর অত্যন্ত তথ্য সম্মৃদ্ধ বক্তব্য দিতেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অংগনে তিনি কাজ করছিলেন ধমুছে। কিন্তু তিনি বিদায় নিলেন। অনেক কাজ তার অসমাপ্ত থাকলো। তিনি তার কর্মের মধ্যেই বেঁচে থাকবেন অনন্ত সময়।
মহান আল্লাহ তাআলা কোরআনুল কারিমে বলেছেন, ‘আমি লোকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছি এই মর্মে যে, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হও। যে কৃতজ্ঞ হয়, সে তো কেবল নিজ কল্যানের জন্যই কৃতজ্ঞ হয়। আর যে অকৃতজ্ঞ হয়, (তার স্মরণ রাখা উচিত) আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।’ (সুরা লোকমান : আয়াত ১২)।
হে আল্লাহ আফতাব ভাই এজকজন আপাদমস্তক কৃতজ্ঞ মানুষ। আপনি তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।
লেখক: সরকার মাজহারুল মান্নান
যমুনা টেলিভিশন    
রংপুর 

সর্বশেষ - প্রচ্ছদ